সম্পাদকীয়
বিলীয়মান হৃৎস্পন্দন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যার একটি বড় অংশ তরুণ সমাজ। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, জীবনঘাতী এ রোগের মানসম্মত ও জরুরি চিকিৎসাসেবা এখনো মূলত বিভাগীয় শহর, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। বিভাগীয় শহরের বাইরে জেলা, উপজেলা বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসা পাওয়া এক প্রকার অলীক স্বপ্ন। এ চিকিৎসাবৈষম্য প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সম্প্রতি ‘আগামীর সময়’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের সিংহভাগ গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে হৃদরোগের মতো একটি মারাত্মক ও জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভাগ্য এবং বিভাগীয় শহরের হাসপাতালের দূরত্বের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চিকিৎসাসেবার এ আঞ্চলিক বৈষম্য সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক চিকিৎসাসেবার অধিকারকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
যেকোনো হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা সময়কে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা স্বর্ণালি সময় বলা হয়। এ সময়ের মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, যেমন—ইসিজি, ট্রপোনিন টেস্ট কিংবা জরুরি এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টি (রিং পরানো) করা সম্ভব হলে রোগীর জীবন বাঁচানো যায়। কিন্তু ঢাকার বাইরে দেশের অধিকাংশ জেলা হাসপাতালে সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিংবা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (কার্ডিওলজিস্ট) থাকেন না। ইকোকার্ডিওগ্রাম বা এনজিওগ্রামের মতো মৌলিক পরীক্ষার সুযোগও জেলা শহরগুলোতে অত্যন্ত সীমিত। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মানুষের হার্ট অ্যাটাক হলে তাকে বিভাগীয় শহর বা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হতে হয়। দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে গিয়ে পথেই অনেকের প্রাণ চলে যায়। যারা পৌঁছাতে পারেন, তাদেরও হৃদযন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
এ চিকিৎসাকেন্দ্রিক অব্যবস্থাপনার মূল কারণ হলো আমাদের স্বাস্থ্য বাজেটের অসম বণ্টন এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাব। ক্ষেত্রবিশেষে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় কোটি কোটি টাকা খরচ করে দামি যন্ত্রপাতি কেনা হলেও টেকনিশিয়ান বা দক্ষ জনবলের অভাবে সেগুলো বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। আবার কোথাও চিকিৎসকের অভাব। আবাসন ও নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক চিকিৎসক ঢাকার বাইরে যেতে চান না। ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পুরোপুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বেসরকারি হাসপাতালের চড়া মূল্যের চিকিৎসার পেছনে ছুটে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিটি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি করে পূর্ণাঙ্গ হৃদরোগ ইউনিট স্থাপন জরুরি–যেখানে সার্বক্ষণিক সিসিইউ সেবা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সহজলভ্য হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেও ইসিজি ও জরুরি কার্ডিয়াক ফার্স্ট এইডের ওষুধপত্র সার্বক্ষণিক মজুদ রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরে ধরে রাখতে হলে বিশেষ ভাতা ও আবাসন সুবিধার পাশাপাশি তাদের উচ্চশিক্ষা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে একজন মানুষ দেশের কোন প্রান্তে বাস করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে তার বেঁচে থাকার অধিকার নির্ধারিত হতে পারে না। গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষক কিংবা শহরের একজন উচ্চবিত্ত—উভয়েরই সমানভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। বিভাগীয় শহরের বাইরে হৃদরোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা শুধু একটি স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নয়, এটি একটি মানবিক দায়িত্বও। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনই উদ্যোগ নিতে হবে যেন দেশের প্রতিটি জেলা ও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ নিজ এলাকাতেই হৃদরোগের আধুনিক ও জরুরি চিকিৎসা পান।



