বন্যায় একটিও মৃত্যু নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে প্রকৃতি নান্দনিক রূপে সাজার পাশাপাশি রুদ্র হয়েও ওঠে। টানা বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণে নদ-নদী, খাল-বিলসহ প্রায় সব রকমের জলাশয় ভরে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পানিপ্রবাহ বিস্তীর্ণ সমতল প্লাবিত হয়ে সৃষ্টি হয় বন্যা। প্রতি বছর এমন বন্যা যেন চিরাচরিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের জন্য। নানা দুর্যোগের পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ বন্যা আক্রান্ত দেশ বলেও পরিচিত। চলতি বর্ষা মৌসুমও ব্যতিক্রম নয়। তবে বন্যা পরিস্থিতি শুধু প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্টও; এটা মনে রাখা দরকার। প্রাকৃতিক বিষয় বলে দায় এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। মনে রাখতে হবে, প্লাবিত এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদ এর সঙ্গে জড়িত।
গতকাল শুক্রবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১০টি স্টেশন বন্যা পর্যায়ে এবং ৯টি স্টেশন সতর্কতা পর্যায়ে রয়েছে। নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি দুশ্চিন্তার কারণ। বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু, নোয়াখালীর ডাকাতিয়া, হবিগঞ্জের খোয়াই, মৌলভীবাজারের মনু নদী এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের কুশিয়ারা-সুরমা ও মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে জলপ্রবাহ বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী এবং তিস্তা নদীর নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি। আরও দুদিন ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পরিস্থিতিই বলে দিচ্ছে, বাস্তবতা স্বাভাবিক নেই; উদ্বেগজনক।
প্রতি বছরই দেখা যায়, প্লাবিত জনপদকে সরকার উপদ্রুত এলাকা ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গড়িমসি করে। মনে রাখা দরকার, প্রত্যেক নাগরিকের জান-মাল রক্ষা ও হেফাজতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেটিকে কল্যাণকর রাষ্ট্র বলা যায় না। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে ১০ নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই এখনই আগাম দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সময়। বন্যায় দেশের বহু জেলার মানুষ ঘরবাড়ি হারায়, হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করে। কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদানও ব্যাহত হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
বন্যা-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি। অনেক এলাকায় অপরিকল্পিত নদী দখল, খাল ও জলাশয় ভরাট, দুর্বল বাঁধ এবং অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বন্যার ভয়াবহতা বেড়েছে। একই সঙ্গে আগাম সতর্কবার্তা অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এবারও বারবার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন অথচ সংশ্লিষ্টরা আমলে নিয়েছে বলে দৃশ্যমান নয়। এবার দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারিত হোক— বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে অার নয় একটিও মৃত্যু।
বন্যা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বন্যাকে কেবল মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার তীব্রতা আরও বাড়বে। তাই সময়ের দাবি— তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি টেকসই ও দূরদর্শী বন্যা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা।




