সম্পাদকীয়
কারাগার নাকি মৃত্যুকূপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কারাগার কোনো মানুষের মৃত্যুকূপ হতে পারে না। আদালত কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দিলে তিনি আইন অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করবেন— এটাই স্বাভাবিক বিচারব্যবস্থার বিধান। কিন্তু বিচারাধীন একজন ব্যক্তি এখনো আইনের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত নন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, বিচার চলছে; আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি। ফলে একজন বিচারাধীন বন্দির কারাগারে থাকা মানে তার স্বাধীনতা সাময়িকভাবে সীমিত থাকা, জীবন ও মৌলিক মানবিক অধিকার হারিয়ে ফেলা নয়। অথচ ‘কারাগারে বেশি মৃত্যু বিচারাধীন বন্দিদের’ শিরোনামে দৈনিক আগামীর সময়ের বিশেষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক এবং রাষ্ট্রের কারা ব্যবস্থাপনা প্রশ্নবিদ্ধ, সেটাই প্রকাশ করে।
কারাগারে একজন মানুষ কেন মারা যাবেন— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু তার ব্যক্তিগত অসুস্থতা দিয়ে বিষয়টি ভাবার সুযোগ নেই। কারাগারের পরিবেশ, ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি, অপর্যাপ্ত চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সীমাবদ্ধতা, হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব এবং দায়িত্বশীলদের অবহেলা—এসব কারণ যদি মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রাখে, তাহলে বিষয়টি নিছক ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে পাশ কাটানো যায় না এবং দায়িত্বশীলদের দায় এড়ানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকে না। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং দায় নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
উন্নত দেশগুলোর কারাগার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার বড় পার্থক্য এখানেই যে, সেখানে বন্দিকে শুধু ‘বন্দি’ হিসেবে দেখা হয় না; তাকে একজন মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। অনেক দেশে কারাগারে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতাল স্থানান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ ও চিকিৎসার ধারাবাহিকতাও গুরুত্ব পায়।
আর বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। শুধু বিদেশের উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতাকে বিচার করলে হবে না। আমাদের সীমিত সম্পদ, বিপুল বন্দি এবং কারাগারের নিজস্ব কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত সংস্কার করতে হবে। কিন্তু অর্থের সীমাবদ্ধতা কখনোই একজন মানুষের জীবন রক্ষার মৌলিক দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রকে অব্যাহতি দিতে পারে না।
দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ১ লাখের বেশি। প্রায়ই কোনো না কোনো কারাগারে অসুস্থ হয়ে বন্দি মারা যান। কিন্তু বিচারাধীন বন্দিদের বেশি মৃত্যুর কারণ দুশ্চিন্তা ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া বলে জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ওয়াকিবহাল মহল। যারা পুরনো বন্দি বা বারবার কারাভোগ করেছেন কিংবা সাজাপ্রাপ্ত— তারা বন্দিজীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। তবে যে বন্দিরা নতুন বা গুরুতর কোনো অপরাধ না করেই কারাভোগ করছেন, তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসামি হওয়া বন্দিরাই বেশি মৃত্যুবরণ করছেন।
যে ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাকেও চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। আর যিনি বিচারাধীন, তাকে তো আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রাখতে হবে। কারাগারগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। কোনো বন্দি চিকিৎসার অভাবে মারা গেলে ‘অসুস্থ হয়ে মৃত্যু’ লিখে ফাইল বন্ধ করা যাবে না। চিকিৎসায় অবহেলা ছিল কি না, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। কারাগারের দেয়াল যত উঁচুই হোক, মানবাধিকারের সীমা তার চেয়েও উঁচু। তাই বিচারাধীন বন্দিদের মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।



