সম্পাদকীয়
রাজধানীর সড়কে যানজটই সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা শহরের যানজটের মহিমার কথা আর নতুন করে কীই-বা বলার আছে! রাজপথে গাড়ি চলে না, চাকা ঘোরে না, শুধু অনন্ত অপেক্ষায় মানুষের আয়ু কমে। এই নরকযন্ত্রণা থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দিতে অবশেষে কোমর বেঁধে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানীর বুক থেকে চারটি প্রধান আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ আর ফুলবাড়িয়ার মতো চিরকালীন জটলাগুলো এবার ঢাকার সীমানা পার করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে ইতিহাস বলছে, ঢাকার রাজপথের দখলদারি মুক্ত করা আর পৌরাণিক কাহিনির ‘গন্ধমাদন’ পাহাড় সরানো একই কথা।
২০১৭ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার তাদের দেড় দশকের শাসনামলের প্রথম মেয়াদে— অর্থাৎ ২০১০ সালে এই টার্মিনালগুলো সরানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল। তারপর? পুরনো দিনের গানের ভাষায় বলতে ইচ্ছা হয়— ‘তার আর পর নেই...!’ ২০২৪ সালে সেই রেজিমের বিদায় হলো গণআন্দোলনের মুখে; কিন্তু ফাইলের ধুলোও নড়ল না। রাজউক জমি দিতে পারল না, আর ঢাকা সিটি করপোরেশনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে রইল। সেই দীর্ঘ শাসনামলে শুধু ফ্লাইওভারের পর ফ্লাইওভার হলো, এক্সপ্রেস হাইওয়ে উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে, মেট্রোরেল এলো তার সর্পিল গতিপথ নিয়ে...। কিন্তু টার্মিনালগুলো যথাস্থানেই থেকে গেল। ফলে, হাজার কোটি টাকার ফ্লাইওভার আর এক্সপ্রেস হাইওয়েতে ওঠানামার মুখে বাসের ঠেলাঠেলিতে আম-জনতার প্রাণ ওষ্ঠাগত হলো। মেট্রো স্টেশনে স্টেশনে যানজট পাকিয়ে উঠল। ঢাকাবাসী আজও পথের যন্ত্রণায় হাড় কালা করে যাচ্ছেন।
এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী এক আলোর দিশা দেখিয়েছিলেন ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। তিনি তেজগাঁওয়ের ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করেছিলেন। পরিবহন মাফিয়াদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাস্তা সচল করেছিলেন। রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২৪৬ রুটকে মাত্র ছয়টি কোম্পানির আওতায় এনে রঙের ভিত্তিতে বাস চালানোর এক বৈপ্লবিক স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন তিনি; কিন্তু সেই স্বপ্নবাজ মেয়রের অকালপ্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই তার যুগান্তকারী পরিকল্পনাও কর্পূরের মতো উবে গেল। আমলারা আবার সেই ফাইলটিকে আলমারির গভীরে বন্দি করে ফেললেন।
আনিসুল হকের মৃত্যুর পর তেজগাঁওয়ের সেই রাস্তা আবার পুরনো চেনা-চেহারায় ফিরল। বাসমালিক আর পরিবহনশ্রমিকরা আবার নিজেদের খেয়ালখুশিমতো রুট আর ভাড়ার নৈরাজ্য কায়েম করে দাপিয়ে বেড়াতে থাকলেন।
তাই, আজকের দিনে নতুন সরকারের এই সদিচ্ছা অবহেলার নয়। প্রধানমন্ত্রী শুধু টার্মিনাল সরানোর নির্দেশই দেননি, হকারদের পুনর্বাসন আর এআই ক্যামেরার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কথাও বলেছেন। শাহবাগ মোড়ে পরীক্ষামূলক ডিজিটাল সিগন্যাল চালুর ভাবনাও বেশ আধুনিক। কিন্তু প্রশ্ন—সরষের ভেতরের ভূত তাড়াবে কে? বিশেষজ্ঞরা তো বলছেন, শুধু টার্মিনাল শহরের বাইরে নিয়ে গেলেই ম্যাজিক হবে না। উন্নত বিশ্বের মতো বাসের নিজস্ব ডিপো থাকতে হবে, যাতে তারা রাস্তার ওপর শুয়ে না থাকে। ঢাকার পরিবহন খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে সিন্ডিকেট আর মাফিয়াতন্ত্র জেঁকে বসে আছে, তাদের ডানা না ছাঁটলে এই নতুন চাকাও কিন্তু কাদার মধ্যেই আটকে থাকবে। পতিত সরকারের আমলের সেই ব্যর্থতার ইতিহাস যেন নতুন জমানায়ও ফিরে না আসে— সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, রাজধানীর সড়কে যেন যানজটই সরকার— সরকার যায় সরকার আসে, ঢাকার রাস্তা বাসের দখলেই থাকে।




