আগামীর চোখ
কার গাড়ি কে চালায় কে মারে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
মহাব্যবস্থাপক, মহাপবিত্র বর্জ্য অপসারণ বিভাগ
সম্প্রতি আমাদের এই মহানগরীর রাজপথে আপনাদের যে বৈপ্লবিক ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ নীতি লক্ষ করছি, তা দেখে নাগরিক হিসেবে কিছু না বলে থাকতে পারলাম না।
এই স্মার্ট যুগে আপনারা যে ‘আউটসোর্সিং’-এর এমন যুগান্তকারী মডেল দাঁড় করিয়েছেন, তা অপূর্ব। সরকারি খাতায় মোটা অঙ্কের বেতনভুক্ত আসল চালকরা ঘরে বসে আরাম করছেন বা অন্য লাভজনক ব্যবসায় মন দিয়েছেন, আর তাদের হয়ে ময়লার ভারী ডাম্প ট্রাকগুলো চালাচ্ছেন খালাসি, মেকানিক বা অনভিজ্ঞ বহিরাগতরা— একে যদি ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ এবং ‘দায়িত্ব ভাগাভাগি’র অনন্য দৃষ্টান্ত না বলা হয়, তবে তা হবে চরম অন্যায়!
প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই আপনাদের সেই মূল চালকদের, যারা নিজেদের স্টিয়ারিং হুইল অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রতি মাসের ১ তারিখে এটিএম বুথ থেকে ঠিকঠাক বেতন তুলে নিচ্ছেন। একেই বলে ‘ওয়ার্ক ফ্রম নোহোয়্যার, স্যালারি ফ্রম হোম’।
‘ফ্লাইং ড্রাইভ’-এর কল্যাণে ঢাকা শহরের পিচঢালা পথগুলো একেকটি জীবন্ত ডেথ-ট্র্যাপ বা যমদূতের আখড়ায় পরিণত হয়েছে
এর চেয়েও রোমাঞ্চকর হলো, আপনাদের বদলি চালকদের বীরত্ব। লাইসেন্স নেই, ভারী যান চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, এমনকি হয়তো ব্রেক কোথায় আর এক্সিলারেটর কোথায়, সেটিও ভালো করে জানা নেই— তাতে কী? মনের জোরে রাজপথের বুক কাঁপিয়ে তারা যেভাবে ময়লার গাড়ি ছোটান, তা যেকোনো আন্তর্জাতিক ফর্মুলা ওয়ান রেসকেও হার মানায়। তাদের এই ‘ফ্লাইং ড্রাইভ’-এর কল্যাণে ঢাকা শহরের পিচঢালা পথগুলো একেকটি জীবন্ত ডেথ-ট্র্যাপ বা যমদূতের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তবে এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। একজন চালকের বেতনে যদি পুরো পাড়ার তরুণরা গাড়ি চালানো শেখার ‘হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ’ পেয়ে যায়, ক্ষতি কী? দু-চারজন মানুষের প্রাণ যাচ্ছে যাক; কিন্তু ড্রাইভিং শেখার এই উন্মুক্ত পাঠশালা তো বন্ধ হতে দেওয়া যায় না! তা ছাড়া প্রতিদিন যানজটে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে আপনাদের বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকের নিচে পড়ে এক নিমেষে জীবনের সব ঝামেলা চুকিয়ে ফেলা যে কত বড় পরম শান্তি, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই বলতে পারতেন!
অতএব মহোদয়, আমার বিনীত অনুরোধ, এই সফল মডেলটি যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়। গণমাধ্যমরা একটু-আধটু লেখালেখি করবেই, ওসবে কান দেবেন না। আসল চালকদের ঘরে বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়ার প্রথা আজীবন জারি রাখুন এবং লাইসেন্সহীন খালাসিদের হাতে আরও বেশি করে ডাম্প ট্রাকের চাবি তুলে দিন। সাধারণ মানুষের প্রাণ তো এমনিতেও সস্তা, অন্তত আপনাদের ‘শহুরে বর্জ্যের’ গাড়ির নিচে চ্যাপ্টা হয়ে মরলে তাদের জীবনটা বরং সার্থক হবে।
ইতি
ভয়ে ভয়ে রাস্তা পার হওয়া এক তটস্থ নাগরিক



