সম্পাদকীয়
পাসের ফাঁস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল নিকট অতীতের চেয়ে ব্যতিক্রম। এই ফল প্রকাশের পর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যানই বলছে, এবারের ফল অতীতের তুলনায় খারাপ— ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫। অথচ ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। গতবারের চেয়ে এ সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এবার যারা পাস করেছে আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই, কামনা করি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
এবারের আরেকটি উদ্বেগের বিষয়, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হতে পারেনি। প্রায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৯ হাজার। অর্থাৎ ছয় লাখের বেশি পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এ সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়— এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখ লাখ পরিবার, তাদের স্বপ্ন-প্রত্যাশা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ। পাশাপাশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব ও মনোযোগ তথা মেধার প্রশ্নটিও সামনে এসে যায়। একটি পাবলিক পরীক্ষায় এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার এতটা কমে গেলে প্রশ্ন উঠবেই— শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল, নাকি শিক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা রয়েছে? গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় গণিত ও ইংরেজিতে খারাপ ফল জাতির জন্য ভবিষ্যতের কোনো শুভ সংকেত বহন করে না।
এবার একটি ইতিবাচক দিকও উল্লেখের দাবি রাখে। বরাবরের মতো এবারও পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮—বিপরীতে ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। মেয়েদের এই ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তারা শিক্ষাক্ষেত্রে কতটা এগিয়ে যেতে পারে। পরিবার ও সমাজের উচিত সামগ্রিক নারী শিক্ষাকে আরও উৎসাহিত করা এবং তাদের উচ্চশিক্ষার পথ নির্বিঘ্ন করা।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার ফলাফলও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। গত ১৫ বছর যে বোর্ডের পাসের হার ৮০-এর নিচে নামেনি, এবার সেই বোর্ডেই পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৫ দশমিক ৪৯। এবার মাদ্রাসা বোর্ডের ২২৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন পরীক্ষার্থীও পাস করেনি। এক বছরে শূন্য পাসের মাদ্রাসা বেড়েছে ১৪০টি। সামগ্রিক ফলের এ দুর্বলতায় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠদান পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠান তদারকি নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার্থীদের তুলনামূলক বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতা ভালো নয়; এটি থাকলে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত দক্ষতা অর্জন না হলে কাগজ-কলমে ভালো ফল কোনো কাজে আসে না। পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা বাড়ায় না; বরং পরবর্তী ধাপে গিয়ে তার দুর্বলতা আরও প্রকট হয়।
এবারের ফলের পেছনে কয়েকটি কারণ বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মুখস্থনির্ভর শিক্ষায় অভ্যস্ত। প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে দিলে কিংবা বিশ্লেষণধর্মী উত্তর চাইলে তারা সমস্যায় পড়ে। দ্বিতীয়ত, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, দুর্বল শিক্ষার্থী শনাক্তকরণ ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তৃতীয়ত, কোচিংনির্ভরতা শিক্ষার মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের বদলে পরীক্ষায় পাস ও জিপিএ ৫ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
যারা এবার অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের প্রতি মানবিক হতে হবে। একটি পরীক্ষার ফল কোনো শিক্ষার্থীর পুরো জীবন নির্ধারণ করে না। তাদের কোথায় দুর্বলতা ছিল, তা শনাক্ত করে আবার প্রস্তুতির সুযোগ ও প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক সহায়তা দিতে, অভিভাবকদের সন্তানকে অপমান বা মানসিক চাপে না ফেলে পাশে দাঁড়াতে হবে।




