সম্পাদকীয়
অর্ধেক আকাশ অন্ধকারে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে নারী স্বাধীনতা ও নারী প্রগতির কথা আমরা গর্বের সঙ্গে বলি। বলি, মেয়েরা এখন আর ঘরের চার দেয়ালে বন্দি নয়; তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, প্রশাসন থেকে রাজনীতি— সবক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। কথাগুলো মিথ্যা নয়। বরং গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়— মেয়েরা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারছে? এ প্রশ্নের জবাবে যা পাওয়া যায়, তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।
গতকাল শনিবারের আগামীর সময়ের ‘শিক্ষা-চাকরির সিঁড়িতে ধাপে ধাপে কমে মেয়েরা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫-এর তথ্য বলছে, মাধ্যমিক ও কলেজপর্যায়ে মেয়েরা ছেলেদের পেছনে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে। ২০১৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশ ছিল ৫৩ দশমিক ৩১ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কলেজপর্যায়ে ২০১৫ সালে নারী শিক্ষার্থীর অংশ ছিল ৪৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশে। অর্থাৎ কলেজে মেয়েরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছে। একই সময়ে কলেজে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ লাখ ৯ হাজার ১৭১ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ লাখ ৮১ হাজার ১২৩। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তা কমে যায়। উচ্চশিক্ষার দরজায় পৌঁছানোর পর সেই অগ্রযাত্রায় ভাটা পড়ে যায়। কেন এমন হয় বা হলো— এ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।
এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে নিরাপত্তা। একটি মেয়ে যখন গ্রামের স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চায়, তখন তাকে অনেক সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। নিরাপদ আবাসন নেই, নিরাপদ ও নিয়মিত যাতায়াত নেই। পরিবারকে প্রতিদিন ভাবতে হয়— মেয়ে কোথায় থাকবে, কীভাবে যাতায়াত করবে, পথে কতটা নিরাপদ থাকবে? ফলে অনেক মেধাবী নারী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও নিরাপত্তার সংকটে থেমে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাল্যবিয়ে ও সামাজিক মানসিকতা। একটি মেয়ে কলেজ পর্যন্ত পড়লেই যেন পরিবারের দায়িত্ব শেষ— এমন ধারণা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। অথচ ছেলের ক্ষেত্রে একই বয়সে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়াকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়।
এখানেই আমাদের সমাজের দ্বিমুখী মানসিকতা স্পষ্ট। মেয়েকে শিক্ষিত করা হয়; কিন্তু সেই শিক্ষার পূর্ণ ব্যবহার করার স্বাধীনতা দেওয়া হয় না। তাকে ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দেওয়া হয়; কিন্তু নিজের পেশা বেছে নেওয়ার সমান সুযোগ সবসময় দেওয়া হয় না। তার প্রতি সমাজের একটা ঋণ আছে, আছে বিনিয়োগ। কর্মক্ষেত্রে গিয়ে সেবার মাধ্যমে সেই ঋণ জাতিকে পরিশোধ করবে— এমন প্রত্যাশাও থাকে সমাজের। তাকে শিক্ষিত করে বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে রেখে ঘরকন্নার কাজ প্রত্যাশা করা স্ববিরোধিতার শামিল।
নারীর কাছে আমরা একই সঙ্গে শিক্ষিত, দক্ষ, উপার্জনক্ষম এবং সর্বক্ষণ ঘরের দায়িত্ব পালনকারী— সবকিছুর প্রত্যাশা করি। কিন্তু সেই পথকে সহজ করার সামাজিক অবকাঠামো সৃষ্টি করি না।
চাকরির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। উচ্চপদে ব্যবধান বড়। সরকারি চাকরিতে প্রথম থেকে নবম গ্রেডে প্রায় ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষার পর চাকরিতে ঢোকার পর্যায়েই নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ পর্যায়েও নারীর উপস্থিতি কম।
মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বানিয়ে দিয়ে শেষ ধাপে তালা লাগিয়ে রাখলে তাকে নারী অগ্রগতি বলা যায় না। সেই তালা খুলতে হবে— শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতায়। বাংলাদেশের উন্নয়নের সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে মেয়েদের সমান পদচারণাই হতে পারে প্রকৃত নারীমুক্তির পরিচয়।



