সম্পাদকীয়
জিরো টলারেন্সের পরীক্ষা

ক্ষমতার দম্ভ, দায়িত্বের সীমালঙ্ঘন কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড— কোনোটির দায় থেকেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে এমন একটি বার্তাই পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় সরকার ও দলের ভেতরে যে সতর্কসংকেত তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনা দুটি ভিন্ন। ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম আসার পর পদ ছাড়তে হয় সংসদ সদস্য মিষ্টিকে। তিনি অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। অন্যদিকে গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্ক তৈরি হয়। ইশরাকের দাবি, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তার কর্মকাণ্ড আইনসম্মত ছিল কি না— তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যেই তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর সামনে আসে।
দুটি ঘটনার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে মিল স্পষ্ট— ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির খড়গ নেমে এসেছে। এ ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে— ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে দায়িত্বের সীমা লঙ্ঘন করলে দলীয় পরিচয় কিংবা মন্ত্রী পদও কাউকে রক্ষা করতে পারবে না।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই কঠোর পদক্ষেপ কি নিছকই প্রতীকী বার্তা, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের স্থায়ী ভিত্তি? অতীতে আমরা দেখেছি, ক্ষমতার ছায়ায় দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রশ্রয়ের সংস্কৃতিই ছিল প্রধান রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। ক্ষমতায় বসার পর রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণে যে ঔদ্ধত্য, দায়মুক্তির প্রবণতা ও প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তা গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য বিপজ্জনক। সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জরুরি।
কিন্তু এই জিরো টলারেন্স কি শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল, নাকি এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নীতিগত অঙ্গীকার? অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে তদন্ত ও বিচারের বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিশোধমূলক রাজনীতির বদলে সংযম ও শালীনতার যে বার্তা দেখছেন অনেকে, তার গুরুত্ব রয়েছে। সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহ্দীন মালিকের ভাষায়, বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে ‘একধরনের শালীনতা ও গণতান্ত্রিক শ্রদ্ধাবোধের ধারা দৃশ্যমান হচ্ছে’। এই ধারাকে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে ব্যক্তিগত আচরণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং জবাবদিহির সংস্কৃতিও নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া সহজ; সেই বার্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত করা কঠিন। জিরো টলারেন্সের অর্থ হতে হবে— কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নন, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারও হবেন না। মিষ্টি ও ইশরাকের ঘটনা দুটি শুধু পদত্যাগের অধ্যায় নয়; এটি ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রধানমন্ত্রীর কঠোরতা যেন ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে সমানভাবে কার্যকর হয়।



