আগামীর চোখ
দড়ি টেনে যাই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
গুণ টানা মাঝি ভাই,
আজ থেকে কয়েক দশক আগে নদীর স্রোতের প্রতিকূলে নৌকা এগিয়ে নিতে আপনারা গুণ টানতেন। সে সময় আপনাদের শরীরের ওপর যে ধকল বয়ে যেত, তা আমরা বইপত্রে পড়েছি। অনুন্নত ওই বাংলায় আপনাদের সেই কায়িক শ্রম ছিল অনিবার্য বাস্তবতা।
দেশ আজ বহুদূর এগিয়ে গেছে। নৌকায় ইঞ্জিন বসেছে। এখন নদীর বুক চিরে নৌকা ছুটে চলে। খরস্রোতা নদীগুলোর বুকে সেতু উঠেছে। তবে আপনি জেনে বোধহয় খুশি হবেন, আপনাদের ‘গুণ টানা ঐতিহ্য’ এখনো হারিয়ে যায়নি। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার গুমানী নদীর কাছিকাটা দাসপাড়ার নিশিবাড়ী ঘাটে এলে দেখতে পাবেন আমার মতো আপনার উত্তরসূরিদের। তফাত শুধু একটাই— আপনারা তখন কয়েকজন মিলে গুণ টানতেন আর এখানে হাজার হাজার মানুষ ‘গুণ টেনে’ নদী পার হন। গুণ টেনে নদী পার হওয়া শুনে একটু আশ্চর্য হতে পারেন। ভাবতে পারেন, ‘নদী পার হতে কীসের গুণ টানা!’ আসলে এটা ওই অর্থে গুণ টানা নয়। সেতু না থাকায় স্থানীয়রা নদীর এপার-ওপার আড়াআড়ি করে মোটা রশি বেঁধেছেন। রশি ধরে নৌকা নিয়ে নদী পার হতে হয়। আমিও এ ঘাটের ‘গুণ টানা’ মানুষ। কদিন আগে গুণ টানতে গিয়ে আপনার কথা মনে পড়ল।
চার দশক ধরে গুমানী নদীর ওপর একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। কিন্তু এখনো কাগজেই আটকে রয়েছে সে দাবি। ফলে প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রশি টেনে নদী পার হন। বর্ষা এলে কেমন দুর্ভোগ হয়, তা আপনার থেকে কে আর ভালো বুঝবে।
আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগে কায়িক শ্রম কমানোর পাশপাশি ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে সর্বত্র। অথচ দেখুন, আমাদের স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা তিন উপজেলার সাতটি গ্রামের মানুষকে কতটা শ্রম আর ঝুঁকির মুখে ফেলছেন! তারা বোধহয় গুণ টানার দৃশ্য বাঁচিয়ে রাখতে চান। তাই সেতুর কাজে হাত দিচ্ছেন না। বলতেই হবে, ঐতিহ্যের প্রতি বেশ টান আছে।
যদি একটি সেতু নির্মাণে এতই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হয়, তাহলে আমাদের ‘গুণ টানা মাঝির’ স্বীকৃতি দিয়ে ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেই তো পারে! কী বলেন মাঝি ভাই? ঐতিহ্যও রক্ষা হলো, কর্তাদের দুশ্চিন্তাও কমল! এ সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত গুণ টেনে যাই, কী বলেন?
ইতি
রশি টেনে নদী পার হওয়া এক নাগরিক




