সম্পাদকীয়
রক্ষকের ঘর অপরাধের ঘাঁটি

পুলিশের প্রধান কাজ অপরাধ দমনের পাশাপাশি দেশবাসীর জানমাল রক্ষাসহ নিরাপত্তা প্রদান ও সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। বহুল প্রচলিত কথায় বলতে হয়— দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন। দুষ্টের অাশ্রয় দেওয়া নয়। অথচ রাজধানীর ভাটারা এলাকায় পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়িতে পুলিশের অভিযানে ৮৫ নারী-পুরুষ আটক এবং মদসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর শুধু চমকপ্রদ নয়, পুলিশের ভাবমূর্তির জন্যও বিব্রতকর। এখানে বড় প্রশ্ন— বাড়িটি প্রকৃত অর্থে যদি পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির মালিকানাধীন হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে এমন কর্মকাণ্ড চলছিল কীভাবে? এ ঘটনাটি নিছক কোনো মাদকবিরোধী অভিযানের খবর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থার প্রশ্নগুলো এক সুতোয় গেঁথে সামনে এসেছে, যা নিঃসন্দেহে পুলিশের জন্য সুখকর নয়।
ওই কর্মকর্তা নিজে কোনো অনৈতিক বা অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন— এমন অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ছাড়া ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে তিনি যদি বাড়িটি ভাড়া দিয়ে থাকেন, তাহলে ভাড়াটিয়া কী করছিলেন, বাড়িটি কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল, মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতেন কি না— এসব প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই স্পষ্ট করতে হবে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মালিকানাধীন বাড়ি অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিষয় থাকে না; পুলিশের পেশাগত ভাবমূর্তির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়।
আরও বিব্রতকর বিষয় হলো— পুলিশের বাড়িতে পুলিশকেই অভিযান চালাতে হয়েছে। যে বাহিনী অন্যের ঘরে অভিযান চালিয়ে অপরাধের আলামত খুঁজে বের করে, সেই বাহিনীর একজন কর্মকর্তার বাড়িতেই যদি অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক— রক্ষকের ঘর যদি অপরাধের আশ্রয়স্থল হয়, তবে নাগরিক নিরাপত্তার দায়িত্ব কার হাতে?
পুলিশের বিরুদ্ধে নানা সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশ, চাঁদাবাজি, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সব অভিযোগ সত্য নয়, আবার সব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ, পুলিশের পোশাকের সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, আইন প্রয়োগের কর্তৃত্ব এবং জনগণের নিরাপত্তার বিষয় জড়িয়ে আছে। একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধ করলে তার দায় ব্যক্তির; কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য বা পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও অপরাধের অভিঘাত পড়ে পুরো বাহিনীর ওপর।
যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে বাড়ির মালিক বা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা জেনেশুনে অপরাধীদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাহলে সাধারণ অপরাধীর মতোই নয়— বরং দায়িত্ব ও পদমর্যাদার কারণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ, আইনরক্ষকের অপরাধ সাধারণ অপরাধের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। যে ব্যক্তি আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাখেন, তিনি যদি সেই ক্ষমতার আড়ালে অপরাধকে প্রশ্রয় দেন, তাহলে তা রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
এ ঘটনায় যদি শেষ পর্যন্ত আবার সেই চেনা দৃশ্য দেখা যায়— কয়েকজনকে আটক, কিছুদিন হইচই, তারপর ফাইল হিমঘরের লাশ— তাহলে জনগণের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হবে। পুলিশের বাড়িতে পুলিশের অভিযান যেন শুধু সংবাদপত্রের মুখরোচক শিরোনাম হয়ে না থাকে।
পুলিশের বাড়ির দরজা যদি অপরাধের জন্য খুলে যায়, তবে সেটি শুধু একটি বাড়ির দরজা নয়; মানুষের আস্থার দরজাও সংকুচিত হবে। আর সেই দরজা দিয়ে যদি অপরাধ ঢুকে পড়ে, তবে তা বন্ধ করার দায়িত্ব পুলিশেরই।



