সম্পাদকীয়
গ্রাহকরা স্বস্তি পাক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পাঁচটি ব্যাংক গুটিয়ে যখন এক করা হলো, তখন বলা হয়েছিল— বড় জাহাজে তুফান কম লাগে। আমানতকারীরা বুক বেঁধেছিলেন। তবে লাভ তো দূরের কথা, নিজের জমানো মূল টাকাতেই পাহারাদার বসানো হলো। আইন এলো আন্তর্জাতিক রীতি মানার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ফতোয়া জারি হলো, টাকা আপনারা পাবেন না, দুই বছরের মুনাফায় ‘হেয়ার কাট’ বা কোপ পড়বে। যেন সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকা দিয়েই লুটেরাদের পাপের কাফফারা দেওয়া হবে। কিন্তু প্রতিবাদ আর চাপের মুখে শেষমেশ সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলো কর্তৃপক্ষ। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাধারণ গ্রাহকরা নিজেদের চাহিদামতো টাকা তুলতে পারবেন। কোনো কর্তন থাকবে না। খবরটি স্বস্তির, কিন্তু এর ভেতরের গল্পটা বড়ই করুণ এবং করুণার।
এই যে মেহেরবানি করে সাধারণ গ্রাহকদের জমা টাকা তোলার অধিকার ফেরত দেওয়া হচ্ছে, এটি কি কোনো অনুদান, নাকি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দয়ার দান? ব্যাংকে আমানত রাখা হয়েছিল চরম প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু সেই টাকা আটকে রেখে এতদিন তামাশা চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠে অর্থমন্ত্রীর পুরনো ‘কথার কথা’ মনে করিয়ে দিচ্ছে। এতদিন কীসের ভিত্তিতে গ্রাহকের পেটে লাথি মারা হলো, সেই হিসাব কে দেবে? অথচ মজার ব্যাপার হলো, করপোরেট গ্রাহকদের ওপর হাত দেওয়ার সাহস কারও নেই। বড় বড় শালিক ফোকলা করে গেল ব্যাংক, আর বলির পাঁঠা বানানো হলো সাধারণ মধ্যবিত্তকে।
ব্যাংক পুনর্গঠনের ঢোল পিটিয়ে এখন ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে বিশাল সরকারি ইসলামী ব্যাংক বানানোর গৌরব করা হচ্ছে। ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ফাইল টানাটানি হচ্ছে, নতুন পর্ষদ বসেছে, ফরেনসিক অডিটের কিচ্ছা শোনানো হচ্ছে। হাজার হাজার মামলা ঠুকে দেওয়ার ফিরিস্তিও দেওয়া হচ্ছে বিজ্ঞপ্তিতে। প্রশ্ন হলো, যখন হাজার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি আর ঋণ মারফত গায়েব হয়ে যাচ্ছিল, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই তথাকথিত বিআরডি বা নিয়ন্ত্রকরা কি চোখ বুজে ঘুমাচ্ছিলেন?
যে দেশে আমানতকারীর নিজের টাকা চাইতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করুণার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সেই দেশের ব্যাংক খাত কতটা দেউলিয়া— তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাধারণ মানুষ হয়তো নিজের জমানো কিছু টাকা নিজের পকেটে ফেরত পাবেন; কিন্তু যে আস্থাটা একবার খোয়া গেছে, সেটি ফেরত আনা সহজ নয়। এতদিন আন্তর্জাতিক রীতির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গ্রাহকের পকেট কাটা হয়েছিল। আন্দোলন আর চাপে পড়ে ভুল স্বীকার করে নিয়ম প্রত্যাহার করা হলো। কিন্তু যেসব লুটেরা ও ব্যবস্থাপনার অনিয়মকারী এই ব্যাংকগুলোকে রসাতলে নিয়ে গেল, তাদের শেষ পরিণতি কী?
কোর ব্যাংকিং একীভূত করা, শাখা কমানো বা নতুন সিইও বসিয়ে বিজ্ঞপ্তির বহর বাড়ানো সহজ। কিন্তু লুটপাট হওয়া টাকা উদ্ধার করে ব্যাংকের রক্তে আবার সতেজতা আনা অতটা সোজা নয়। সাধারণ মানুষকে আপাতত টাকা তোলার সামান্য স্বাধীনতা দিয়ে মূল অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করলে ভুল হবে। সাধারণ গ্রাহকের রক্ত পানি করা আমানতের ওপর আর কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না চালিয়ে আসল অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই এখন সময়ের দাবি। নইলে আজকের এই একীভূতকরণের গল্প কালকে আরও বড় কোনো আর্থিক বিপর্যয় ঢেকে রাখার ঢাল ছাড়া আর কিছুই হবে না।







