সম্পাদকীয়
রোগে জোয়ার সেবায় ভাটা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাষ্ট্র উন্নয়ন আর অগ্রগতির গান গেয়ে গলা শুকিয়ে ফেলছে, ঠিক তখনই আমরা অক্লান্ত জনগণ করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে হাম নামের ভাইরাসে প্রাণ যাচ্ছে শত শত শিশুর, অন্যদিকে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ভিড় হাসপাতালগুলোতে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সাফল্য বাংলাদেশকে বৈশ্বিক দরবারে এনে দিয়েছিল এক বিরল গৌরব। কিন্তু সেই অহংকার আজ চুরমার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত গাফিলতি এবং টিকাদানের সর্বজনীন শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার যে খেসারত দেশ দিচ্ছে, তা এক জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ছয়টি প্রতিরোধযোগ্য টিকার অন্যতম ‘হাম’ যেভাবে রাজত্ব করছে, তার মাশুল গুনছে অবোধ শিশুরা।
ছয় মাসে প্রায় এক হাজার শিশুর প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়া এবং লক্ষাধিক আক্রান্তের পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, আমাদের টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকারের সময়ও এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না, যা স্বাস্থ্য প্রশাসনের অদক্ষতাকেই চিহ্নিত করে। তিন মাসের শিশু আয়াত থেকে শুরু করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যন্ত্রণায় ছটফট করা শিশুদের পরিণতি আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে— মা ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে বুলি আমরা আওড়াই, তা কতখানি ফাঁপা। হামের ভাইরাসে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের অন্যান্য জটিল রোগে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের তদারকির অভাব, টিকার সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা এবং তৃণমূল পর্যায়ে টিকাদান অভিযান স্থবির হয়ে পড়ার কারণেই আজ লক্ষাধিক শিশু জীবনের শুরুতেই শারীরিক বিকলাঙ্গতা কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি।
অন্যদিকে, দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রনিক রূপ নিয়েছে। বছর আসে বছর যায়, মেয়র পরিবর্তন হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু এডিস মশার রাজত্ব কমে না। এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু এবং হাসপাতালে রেকর্ডসংখ্যক ভর্তি রোগীর ভিড় প্রতিদিন আমাদের স্বাস্থ্যসেবার অক্ষমতাকে চরমভাবে উপহাস করছে। ডেঙ্গু দমনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিতে পারার পেছনে মূল কারণ স্থানীয় সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। মশক নিধনে প্রতি বছর শতকোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ থাকে। কিন্তু নিচু মানের কীটনাশক ক্রয়, কেনাকাটায় অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে কাজের কাজ কিছুই হয় না। মশা মারার ধোঁয়া এবং ওষুধ ছিটানোর যে লোকদেখানো মহড়া প্রতি বছর দেখা যায়, তা যে শুধু মশার ওষুধ বিক্রির নামে অর্থ লোপাটের মাধ্যম, তা সাধারণ মানুষের কাছে আর গোপন নেই।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসপাতালগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা ও অনীহা। ডেঙ্গু রোগীদের আইসিইউ, শয্যা বা রক্তসংকটে দিশাহারা হতে হয়। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কোনো দূরদর্শী উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। সদিচ্ছা ও সমন্বয়ের তীব্র ঘাটতিতে সাধারণ পরিবারগুলো শেষ সম্বল বিক্রি করে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাত একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু বছরের পর বছর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং দুর্নীতির কারণে এই খাত এখন তাসের ঘরে পরিণত হয়েছে। শিশুদের বাঁচানোর টিকা ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং মশানিধনে প্রকৃত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভাষণ এই মৃত্যুমিছিল থামাতে পারবে না। জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা আর ছিনিমিনি খেলা বন্ধ না হলে রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ব্যর্থতার দায় এড়ানো অসম্ভব।





