ক্ষত ও উপশম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অর্থনৈতিক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তা ও সমালোচনা দীর্ঘদিনের। ঋণখেলাপি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ পরিস্থিতিতে খেলাপি ঋণ কিনতে বিশেষ কোম্পানি বা ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (ডিএএমসি) গঠনের সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এই মডেল সফলভাবে কাজ করছে।
ডিএএমসি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই বিশেষ কোম্পানি আর্থিক খাতে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। এটি গঠন কেবল ব্যাংকের খাতা পরিষ্কার করার মাধ্যম নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণে মনোযোগ দিতে পারবে। ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের বিনিময়ে বা বন্ডের মাধ্যমে এই খেলাপি ঋণ ডিএএমসির কাছে বিক্রি করবে। ফলে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের তারল্য বা নগদ টাকার সংকটের উপশম হবে। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট থেকে যখন বছরের পর বছর ঝুলে থাকা খেলাপি ঋণ চলে যাবে, তখন ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো হবে। সাধারণ ব্যাংকগুলোর মূল কাজ আমানত নেওয়া এবং ঋণ দেওয়া; তাদের আইনি বা ঋণ আদায় টিম অনেক বড় খেলাপিদের পেছনে ঘোরার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
ডিএএমসি যেহেতু কেবল ওই কাজের জন্যই গঠিত হবে, তাই তাদের কাছে দক্ষ আইনি ও কৌশলগত টিম থাকবে। এতে ঋণ আদায়ের হার বাড়াবে।
খেলাপি ঋণ কেনাবেচার বাজারও সৃষ্টি হবে নিঃসন্দেহে। এতে অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহ বাড়বে, পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। অনেক সময় ভালো উদ্যোক্তারাও পরিস্থিতিগত কারণে খেলাপি হয়ে যান। ডিএএমসি প্রয়োজনে বন্ধ বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করে তা আবার সচল করতে পারবে। সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধােন ও নজরদারিতে থাকায় এ উদ্যোগ সফল হবে বলে আশা করা যায়। ব্যাংক থেকে কোনো খেলাপি সম্পদ কিনলে সেটি কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হবে না; বরং আলাদা ট্রাস্টের নামে তা থাকবে। কোনো কারণে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ট্রাস্টে থাকা সম্পদে কোম্পানির পাওনাদারদের দাবি থাকবে না। এ ব্যবস্থায় একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি হবে ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে। ডিএএমসির আইনে ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ওই টাস্কফোর্স খেলাপি সম্পদ শনাক্ত, তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ উদ্ধার ও আইনি ব্যবস্থা সমন্বয়ের কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বাধ্য করা হবে।
এখানে বলে রাখা দরকার, ডিএএমসি যেন দ্রুত খেলাপিদের সম্পত্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, সেজন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা দরকার। প্রয়োজনে বিশেষ দেউলিয়া আদালত বা দ্রুত নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। এই কোম্পানি যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা প্রভাবশালীদের সুবিধা দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
যেহেতু খেলাপি ঋণ আমাদের অর্থনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, সেহেতু ডিএএমসি গঠন এই ক্ষত নিরাময়ের একটি চমৎকার উপায় হতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এই কোম্পানিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। দেশি-বিদেশি আর্থিক ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হওয়া উচিত। এই উদ্যোগ সফলতার পথে অন্তরায় হতে পারে রাজনৈতিক কুপ্রভাব। সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ব্যাংক খাতের সহযোগিতা এবং সঠিক আইনি সহায়তাই পারে এই বিশেষ কোম্পানিকে সফল করতে এবং দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে।




