ফুসফুসও পুড়ছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের গ্রাম মানেই একসময় ছিল সবুজ মাঠ, নির্মল প্রকৃতি, খোলা আকাশ আর বিশুদ্ধ বাতাসের উৎস। শহরের ধোঁয়া, যানজট আর কারখানার দূষণে অতিষ্ঠ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস খুঁজতে গ্রামে বেড়াতে যেতেন। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, গ্রামের পরিবেশই সুস্বাস্থ্যের অনুকূল। কিন্তু বিশ্ব ফুসফুস দিবসে প্রকাশিত একটি সংবাদে বাস্তবতা যেন সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকে এক ব্যঙ্গচিত্রে পরিণত করেছে। গতকাল শুক্রবারের দৈনিক আগামীর সময়ে ‘বিশুদ্ধ বাতাসের গ্রামেই ফুসফুসের রোগে মৃত্যু বেশি’ শিরোনামের প্রতিবেদন যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— আমরা আসলে কত বড় আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে বাস করছি।
প্রশ্ন হলো, গ্রামে যদি বাতাস এতই বিশুদ্ধ হয়, তাহলে সেখানে ফুসফুসের রোগে মৃত্যুর হার বেশি কেন? নাকি আমাদের বিশুদ্ধতার সংজ্ঞাটাই ভুল ছিল? হয়তো আমরা বিশুদ্ধ বাতাস বলতে বুঝেছি রান্নাঘরে ভারী জ্বালানির ধোঁয়া, ইটভাটার কালো ধোঁয়া, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া কিংবা ধুলোবালিতে ভরা কাঁচা রাস্তার বাতাসকে। হয়তো আমরা এমন এক বিশুদ্ধতার গল্প শুনেছি, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
গ্রামের অসংখ্য পরিবার এখনো কাঠ, খড়, পাতা, গোবর কিংবা অন্যান্য জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে থাকে। রান্নাঘরের ভেতরে বছরের পর বছর জমে থাকা ধোঁয়া নারী ও শিশুদের ফুসফুসকে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কিন্তু এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। কারণ, ধোঁয়া যদি রান্নাঘরের হয়, তাহলে তা নাকি উন্নয়নের আলোচনায় পড়ে না। শহরের গাড়ির ধোঁয়া নিয়ে সেমিনার হয়, কিন্তু গ্রামের চুলার ধোঁয়া যেন গবেষণারও অপাঙ্ক্তেয়।
গ্রামাঞ্চলে তামাক ব্যবহারের হারও শহরের তুলনায় বেশি। ২০১৭ সালের গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভের তথ্য বলছে, গ্রামে ১৫ বছর বা এর বেশি বয়সীদের ৩৭.১ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করে। শহরে এ হার ছিল ২৯.৯ শতাংশ। বর্তমানে বেড়েছে বৈ কমেনি। ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল, সাদাপাতা ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকও গ্রামে বেশি ব্যবহৃত হয়। ফলে রান্নার ধোঁয়া ও ঘরের বায়ুদূষণের পাশাপাশি তামাকের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংস্পর্শ গ্রামীণ মানুষের শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, গ্রামকে আমরা এখনো বিশুদ্ধ বাতাসের স্বর্গ বলে প্রচার করি, অথচ অনেক গ্রামের পাশে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা ও বায়ুদূষণকারী স্থাপনা। কৃষিজমি ও বসতবাড়ির মাঝখানেই ধোঁয়ার চিমনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ প্রশ্ন করলে জবাব আসে— এটাই উন্নয়ন। ফলে মানুষ যেন এমন এক উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে, যেখানে ফসলের সঙ্গে সঙ্গে ফুসফুসও পুড়ছে।
এই সময়ে এসে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। গ্রামীণ বায়ুদূষণকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে স্বীকার করতে হবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে, রান্নাঘরে নিরাপদ চুলা ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ ও পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসের রোগ নির্ণয়ের আধুনিক সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে যে, ধোঁয়া শুধু চোখ জ্বালায় না, জীবনও কেড়ে নিতে পারে।
বিশুদ্ধ বাতাসের গল্প শোনানো সহজ, কিন্তু বিশুদ্ধ বাতাস নিশ্চিত করা কঠিন। যদি আমরা এখনই বাস্তবতাকে স্বীকার করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে শুধু ফুসফুস নয়, সমগ্র জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।



