সম্পাদকীয়
নতুন মোড়কে পুরনো মুড়ি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার সড়ক যেন নিত্যদিনের এক অবিরাম বিশৃঙ্খলার মঞ্চ। এখানে যাত্রী ওঠে, যেখানে বাস দাঁড়ানোর কথা নয়, আবার বাস যেখানে দাঁড়ায়, সেটা স্টপেজ নয়। একই রুটে একাধিক বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে, কে আগে যাত্রী তুলবে, কে আগে মোড় পার হবে, কে অন্য বাসকে টপকে যাবে— এই প্রতিযোগিতায় পথচারী ও যাত্রীদের নিরাপত্তা তাদের কাছে উপেক্ষিত। বাসচালকদের বেপরোয়া চালনা ও গতির শিকারে আহত হয়ে পঙ্গু ও নিহতের ঘটনা অনেক পরিবারের বিষাদের স্মৃতি। বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু সমস্যা রয়ে গেছে প্রায় আগের জায়গাতেই।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ১ নভেম্বর থেকে ছয়টি রুটে রেশনালাইজেশনের জন্য নতুন ‘সিটি পরিবহন’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির বাসকে একীভূত করে নির্দিষ্ট রুটে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ভালো, বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা। তবে কথা হলো, পুরনো সমস্যাগুলোর বড় অংশ অমীমাংসিত রেখে নতুন ব্যবস্থার নাম ও কোম্পানির পরিচয় বদলালে কি পরিবর্তন আসবে?
অাগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘পুরনো ব্যর্থতার বৃত্তে নতুন জোড়াতালির শুরু’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, পাঁচ বছর আগে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। একই রুটে অন্য কোম্পানির বাস চলতে থাকায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়নি। বাসস্টপেজ ও অবকাঠামোগত ঘাটতি ছিল। শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। এবারও যদি সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া না হয়, তাহলে এটি সংস্কার নয়, বরং নাম বদলের আরেকটি মহড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাসের নাম নয়, পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে। রুট রেশনালাইজেশনের মূল দর্শন ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন বিচ্ছিন্ন বাস পরিচালনার বদলে কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট বাস চলবে, মালিক বিনিয়োগের বিপরীতে লভ্যাংশ পাবেন এবং যাত্রী তোলার জন্য চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না।
ঢাকার গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলার অন্যতম উৎস হলো ‘টার্গেটের’ চাপ। চালক ও সহকারীর আয় যদি যত বেশি যাত্রী তোলা যায় তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে, তাহলে তাকে নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামানোর কথা বলা যতই সুন্দর শোনাক, বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন। একজন চালককে তখন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়ে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতাই বেশি তাড়িত করবে। ফলে বাস ছুটবে, হঠাৎ ব্রেক করবে, যেখানে-সেখানে থামবে, অন্য বাসকে ওভারটেক করবে। এভাবেই সড়কে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
ঢাকার মানুষ আর নতুন নামের গণপরিবহন চায় না; তারা চায় নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ ও সম্মানজনক গণপরিবহন। প্রতিদিন বাসের পেছনে দৌড়ানো, চলন্ত বাসে ওঠা, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাস থামানো, এক বাসের সঙ্গে আরেক বাসের প্রতিযোগিতা দেখা— এসব কোনো আধুনিক রাজধানীর স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না।
নতুন উদ্যোগটি যেন আবারও ‘পুরনো ব্যর্থতার বৃত্তে নতুন জোড়াতালি’ হয়ে না থাকে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। ঢাকার সড়কে আর পরীক্ষার পর পরীক্ষা চালানোর সুযোগ নেই। বহু বছর ধরে যানজট, বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনা ও দুর্ভোগের মূল্য দিচ্ছে নগরবাসী। এবার প্রয়োজন নাম বদলের নয়, ব্যবস্থা বদলের।



