সম্ভাবনা এবং সক্ষমতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বেইজিংয়ের গ্রেট হলে লালগালিচায় পা রাখলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াংয়ের সঙ্গে তার এ বৈঠক শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি নয়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও নতুন সমীকরণের বার্তা দিচ্ছে। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের পারদ এখন বেশ উঁচুতে। সই হলো মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক। ব্যবসা, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে ভাষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান— সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অংশীদারত্ব এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল। তবে এ সফরের সবচেয়ে বড় চমক বেইজিংয়ের ‘ডাইরেক্ট কানেকটিভিটি’ বা সরাসরি সংযোগের প্রস্তাব। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে চায় বেইজিং। এ প্রস্তাবের ভেতরে আছে বিপুল ও অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। পাশাপাশি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও আরাকান রাজ্যের জটিলতা বাড়তি সতর্কতার দাবি রাখে।
মিয়ানমারের ওপর দিয়ে এ সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ সরাসরি যুক্ত হবে চীনের মূল অর্থনীতি এবং আসিয়ান (ASEAN) জোটের শক্তিশালী বাজারগুলোর সঙ্গে। কৌশলগতভাবে এ সংযোগ ঢাকাকে এক বিশাল বাণিজ্যিক সুবিধা দেবে। বাংলাদেশ ও চীন যদি এই আঞ্চলিক সংযোগে ভারতকেও শেষপর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হয়, তবে গোটা অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। অন্যদিকে, তিস্তার পানি নিয়ে দিল্লির সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন এবং উদাসীনতার পর, চীনের জল-ব্যবস্থাপনা ও নদী খননের প্রতিশ্রুতি ঢাকাকে এক বড় স্বস্তি দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় আগ্রহ ঢাকাকে এক নতুন কূটনৈতিক শক্তি জোগাবে।
বিনিয়োগের খতিয়ানটিও এবার বেশ ভারী। চীনের ৮০টি শীর্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন তার ১৮০ দিনের বিশেষ অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা। আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলা পোর্টের আধুনিকায়ন নিশ্চিতভাবেই চীনা পুঁজির পথ সুগম করবে। এমনকি চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। শুধু কারখানা বা বন্দর নয়, ঢাকার জনশক্তিকে আধুনিক করতে বাংলাদেশে চালু হতে যাচ্ছে ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ। তৈরি হবে বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল। তবে এসব উজ্জ্বল সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে রোহিঙ্গা সংকটের কাঁটা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার কারণে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের মধ্যস্থতার আশ্বাস ঢাকার জন্য কিছুটা স্বস্তির। তবে বেইজিং মিয়ানমার সরকারকে কতটা রাজি করাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।
সব মিলিয়ে বেইজিং সফর থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি অনেক। কিন্তু সম্ভাবনার এই সুযোগের পেছনে রয়েছে এক বিরাট পরীক্ষা। বেইজিংয়ের প্রস্তাবিত এই করিডর এবং বিপুল চীনা বিনিয়োগের ব্যবস্থাপনা-সক্ষমতা বাংলাদেশ কতটা দেখাতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে সব। চীন ও ভারতের মতো দুই প্রতিবেশীর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা ঢাকার জন্য সহজ নয়। বেইজিংয়ের এই বিশাল ঋণ যেন ফাঁদ না হয়ে আসে। এই ফাঁদ এড়িয়ে কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা যায়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের হাত ধরে আসিয়ান বাজারে প্রবেশের এই মহাসড়কে হাঁটতে গেলে ঢাকাকে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার চরম পরীক্ষা দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এখন সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেওয়ার উপযুক্ত সময়। বেইজিংয়ের দেওয়া এই তাস ঢাকা কীভাবে খেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।




