সম্পাদকীয়
ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যা ঘটে গেল, তা এককথায় নজিরবিহীন। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও শীর্ষ পদ নিয়ে রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদ যেভাবে উত্তপ্ত হলো, তা ব্যাংক দখলের রাজনীতিতে এক নতুন কালো অধ্যায়। আগামীর সময় পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো এ আশঙ্কাজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর মাত্র ৯ দিনে গ্রাহকরা ব্যাংকটি থেকে ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছেন। বিপরীতে নতুন আমানত এসেছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, ব্যাংকটির ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) নেগেটিভে চলে গেছে। নগদ টাকার সংকট সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
একটি ব্যাংকের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের কারণে দুনিয়ার কোথাও এভাবে গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার নজির মেলা ভার। আসলে এ ব্যাংকের জন্ম, মালিকানা বদল এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে রাজনীতি। অতীতে এক রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা এ ব্যাংকটিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে রাষ্ট্রীয় শক্তির জোরে ‘দখল’ করেছিল এস আলম গ্রুপ। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর আবার পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। ওই রাজনৈতিক শক্তি ফের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এখন নতুন চেয়ারম্যানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, কিন্তু যেভাবে এই ঘটনায় কেউ কেউ নানা পরিচয়ে জল ঘোলা করছে, তা স্পষ্টত রাজনৈতিক টানাটানি।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্য ও নোটিসেও এর ইঙ্গিত মেলে। সংসদে সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, ব্যাংকের ওপর রাজনৈতিক ছড়ি ঘোরানোর খেলাটি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে অকপটে বলেছেন, ‘ব্যাংকটি দখলের সময় যে যাতনা বা পন্থায় তা হয়েছিল, এখন তা বেদখল হওয়ার সময় সেই একই যাতনা অনুভূত হওয়াটাই স্বাভাবিক।’ তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, ৫ আগস্টের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ বিতরণ করা হয়, যা কোনো এক দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অভিযোগ, একটি গোষ্ঠী ব্যাংকটি অচল করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে।
ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক কার্যালয় নয়, এটি চলে মানুষের বিশ্বাসের ওপর। যখনই কোনো ব্যাংককে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, ভুয়া ঋণ দেওয়া হয় কিংবা নিজেদের লোক বসানোর প্রতিযোগিতা চলে— তখন ধস নামে জনআস্থায়। আর ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট ছোঁয়াচে রোগের মতো।
এ চরম সত্যটিই মনে করিয়ে দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকাররা উদ্বিগ্ন। ব্যাংকটি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এবং বিষয়টির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিকীকরণও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি স্পষ্ট জানান, এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো ব্যাংক খাতে।
ইসলামী ব্যাংকের এ দশা দেশের অর্থনীতির জন্য এক মস্ত বড় সতর্কবার্তা। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ভুলে অবিলম্বে এ বৃহত্তম ব্যাংকটি রক্ষা করা। না হলে এ আগুনের আঁচ থেকে দেশের আর্থিক খাতগুলো বাঁচানো কঠিন হবে।




