বুর্গেনস্টকের কুয়াশা, শান্তি কি মরীচিকা?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যের মরুঝড়ে কি শান্তির হাওয়া এসে লাগবে না? নাকি এ কেবলই আর এক নতুন সংঘাতের মহড়া? ১০৭ বছর আগে যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের চুক্তি হয়েছিল, সেই ফ্রান্সের ভার্সাই প্যালেসেই গত বৃহস্পতিবার ডিজিটাল সই করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক বিশ্বরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে আসছিল। কিন্তু বিধি বাম। শান্তির এই বাতাবরণ যতটা চটকদার, ভেতরের সমীকরণ ততটাই জটিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশার আলোটুকু দপ করে নেভার উপক্রম হয়েছে। ফ্রান্সের ভার্সাই প্যালেসে ডিজিটাল সইয়ের কালি শুকোতে না শুকোতেই শঙ্কা তৈরি হলো। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে শুক্রবার যে শান্তি আলোচনার আসর বসার কথা ছিল, শেষ মুহূর্তে তা থমকে গেল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর আকস্মিক বাতিল হতেই তাই প্রশ্ন উঠেছে— শান্তিচুক্তি কি তবে আঁতুড়ঘরেই মারা গেল?
হোয়াইট হাউজ বলছে, এই আলোচনা সহজ ছিল না। কিন্তু পর্দার পেছনের গল্প অন্য। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধু মুখে বা সইয়ে কাজ হবে না। আলোচনার টেবিলে বসার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নে আমেরিকার স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে চায় তারা। শুধু তা-ই নয়, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট যেখানে আগেই সই করে দিয়েছেন, সেখানে বুর্গেনস্টকের বিলাসী রিসোর্টে এসে নতুন করে আনুষ্ঠানিকতার নাটক করার কোনো প্রয়োজন দেখছে না ইরান।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের হিসাব মেলাতে গিয়ে দিশাহারা ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর আরও আট হাজার কোটি ডলারের যুদ্ধকালীন বরাদ্দ চাইছে। ঘরের মাঠে রিপাবলিকান দলের একাংশই ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে গিয়ে ট্রাম্প ইরানের কাছে কার্যত ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ করে বসেছেন। যে ট্রাম্প ইরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার, শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার হুংকার দিয়েছিলেন, সেই ট্রাম্পই এখন তেহরানের অর্থনীতি সচল করতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আটকে থাকা সম্পদ ছেড়ে দিচ্ছেন। তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছেন। অথচ ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য— ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা— তার কিছুই অর্জিত হয়নি। উল্টো আয়াতুল্লাহ খামেনির হুংকার, আমেরিকা অতিরিক্ত দাবি করলে তা মানা হবে না। তারা পরাশক্তির আক্রমণ সামলে এখন বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী।
সবচেয়ে বড় জট পাকিয়েছে লেবাননকে কেন্দ্র করে। চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন ও বিমান হামলা জারি রেখেছে ইসরায়েল। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তি মানতে নারাজ। উল্টো নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে লেবাননে দখলদারিত্বের পরিধি বাড়াচ্ছে তেল আবিব। যার তীব্র সমালোচনা করেছেন স্বয়ং ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননের ভাইদের বিপদে ফেলে তারা পিছু হটবে না। দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা না সরলে মার্কিন-ইরান খসড়া চুক্তি স্রেফ কাগজের টুকরোয় পরিণত হবে, তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
আপাতত হরমুজ প্রণালি খুলে যাওয়ায় তেলের দাম কিছুটা কমেছে। কিন্তু এই স্বস্তি কতক্ষণের? ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ কেবলই একটা সাময়িক বিরতি, নাকি স্থায়ী শান্তির পথ—তা বলা অসম্ভব। বুর্গেনস্টকের পার্বত্য রিসোর্টের মেঘ ছুঁইছুঁই কুয়াশার মতোই অন্ধকার মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ। ট্রাম্পের তাড়াহুড়ো আর নেতানিয়াহুর জেদের আগুনে শান্তির এই খসড়া দস্তাবেজটি পুড়ে ছাই হয়ে যায় কি না, সেটাই এখন দেখার।




