সম্পাদকীয়
প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তি

মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও জট নিরসন দেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে, বাদী-বিবাদীকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়, আইনজীবীর পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়, সময় নষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় পার হয়ে যায়। বিচারপ্রার্থীর এ দীর্ঘ দুর্ভোগ কমাতে বিরোধ নিষ্পত্তির যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেটিই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজল্যুশন (এডিআর)। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা উদ্যোগ ও আইনগত ব্যবস্থার পরও এডিআর এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এ বিষয়ে গতকাল রবিবার আগামীর সময়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বিরোধের দ্রুত, কম খরচে এবং তুলনামূলকভাবে সহজ সমাধানের উদ্দেশ্যেই এডিআর ব্যবস্থার বিকাশ। কিন্তু পক্ষগুলোর অনমনীয়তা, সমঝোতায় অনাগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।
এডিআরের মূল উদ্দেশ্যই হলো— প্রতিটি বিরোধ আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় না নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এখানে জয়-পরাজয়ের বদলে সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে অনেক পক্ষই মনে করে, তারা কেন ছাড় দেবে? প্রতিপক্ষ আগে ছাড় দিক— এ মানসিকতা বিরোধ মীমাংসার পথ কঠিন করে তোলে। ফলে যে বিরোধ আলোচনার টেবিলে অল্প সময়েই নিষ্পত্তি হতে পারত, সেটিই আদালতে বছরের পর বছর চলতে থাকে। বিশিষ্ট আইনজ্ঞদের অভিমতও এরকম। তারা বলেছেন, বর্তমানে অনেক আইনে সরাসরি বলা আছে যে, মামলা এডিআরে পাঠাতে হবে। তারপরও বিরোধ এডিআর পদ্ধতিতে মীমাংসার সংখ্যা আশানুরূপ নয়। অথচ গ্রামীণ সালিশ সমাজের একটি প্রচলিত রেওয়াজ। গ্রামের মানুষ সেই সালিশের বিচার মেনে নিতেন। কিন্তু আদালতে যেসব মামলা চলছে, সেসব ক্ষেত্রে সালিশ বা মধ্যস্থতা মেনে নিতে পারছে না পক্ষগুলো। তবে কথা হলো, বিচারপ্রার্থীদের অনমনীয়তাকে দায়ী করলেই সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এডিআরকে কার্যকর করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ মধ্যস্থতাকারী, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছতা এবং পক্ষগুলোর আস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। একজন বিচারপ্রার্থী যদি মনে করেন আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই আদালতের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকেই বেশি নিরাপদ মনে করবেন। তাই এডিআরের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করা জরুরি।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বের দাবি রাখে, এডিআরকে শুধু আইন করে প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; এর কার্যকারিতা নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে। তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কোনো ব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা কঠিন।
মামলাজট কমানোর ক্ষেত্রে এডিআই হতে পারে কার্যকর একটি উপায়। কিন্তু এজন্য প্রথমেই মামলার ধরন অনুযায়ী কোন বিরোধগুলো এডিআরের জন্য বেশি উপযোগী, তা নির্ধারণ করা দরকার। দেওয়ানি, পারিবারিক, ব্যবসায়িক, চুক্তি-সংক্রান্ত এবং অন্যান্য সমঝোতাযোগ্য বিরোধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা ও আপসের সুযোগ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে যে বিষয়গুলো আইনগতভাবে আপসযোগ্য নয় বা যেখানে গুরুতর অপরাধের প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোকে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়াতেই রাখা সমীচীন হবে।
এডিআরকে জনপ্রিয় করতে আদালত, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীর মধ্যে সমন্বয়ও বাড়াতে হবে। মামলার পর সংশ্লিষ্ট পক্ষকে এডিআরের সুযোগ ও সম্ভাব্য সুবিধা সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে জানানো যেতে পারে। আদালতও উপযুক্ত মামলায় পক্ষগুলোকে মধ্যস্থতার সুযোগ নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করতে পারেন। একই সঙ্গে আইনজীবীদের মধ্যেও এডিআর বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।



