উপজেলা না প্রশিক্ষণ কেন্দ্র!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার এক দুর্গম ইউনিয়ন থেকে লিখছি। আমাদের এই ২ হাজার ১০০ বর্গমাইলের বিশাল দ্বীপে যেকোনো নতুন কর্মকর্তা আসেন, কাজ শেখেন এবং যেই মুহূর্তে তারা দক্ষ হয়ে ওঠেন– ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের মূল ভূখণ্ডের জেলা বা উপজেলায় বদলি করে দেওয়া হয়। অনেক কর্মকর্তা আবার চাকরিতে যোগ দিয়েই চলে যান দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে। এসব দেখে হাতিয়া কি উপজেলা না ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’— তা ভেবে পাই না।
কেন এমন অভিযোগ করছি, সে বিষয়ে আসি। একটু বিপদেই পড়েছি। নইলে আর পাঁচজন দ্বীপবাসীর মতো আমিও চুপচাপ থাকতাম হয়তো। আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর সব বন্দোবস্ত প্রায় সম্পন্ন করেছি। দিনমজুরির টানাপড়েনের এই সংসারে তার বিদেশে যাওয়াটা ভীষণ জরুরি। ভিসা ও বিমান ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে আমার শেষ সম্বল বসতভিটা লাগোয়া জমিটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ক্রেতাও প্রস্তুত। কিন্তু বিধি বাম! জমি বিক্রির জন্য খতিয়ান সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ল।
মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই কি আমাদের প্রতি এমন অবহেলা?
ভূমি অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কয়েক দিন আগেই বদলি হয়ে গেছেন। শুনেছি, এর আগে তিনি ছিলেন প্রশিক্ষণে, ফেরার পর মাত্র দেড় মাস কাজ করেছিলেন। এখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একাই দুটি দপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’র মতো লড়ে যাচ্ছেন। আমার ফাইলটি অনেক নিচে পড়ে আছে। ফাইলে হাত পড়তে যতদিন লাগবে, তার আগেই বোধ হয় নতুন কর্মকর্তা চলে আসবেন। এসে আমার ফাইলে হাত দেওয়ার আগেই হয়তো প্রশিক্ষণেও চলে যাবেন!
সময়মতো টাকা দিতে না পারলে ছেলের ভিসাটাও হবে না। এখন আপনি কি চান এই দ্বীপের আর দশটা যুবকের মতো কর্মহীন হয়ে ঘুরে বেড়াক আমার সন্তান? মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই কি আমাদের প্রতি এমন অবহেলা?
প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর সামাজিক নানা প্রতিকূলতা আমাদের জীবনের গতিকে থমকে দিতে চায় বারবার। নদীভাঙন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আর তীব্র পানি সংকটের মতো নানামুখী সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমরা হাতিয়াবাসী লড়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। কিন্তু সরকারের বদলি প্রক্রিয়ার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা তো আমাদের নেই।
তাই আপনার প্রতি অনুরোধ, হাতিয়াকে আর ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ কিংবা ‘অবকাশযাপন কেন্দ্র’ বানিয়ে রাখবেন না। কর্মকর্তারা যেন দ্বীপে থাকেন, সে ব্যবস্থাটুকু করুন। নইলে আমার মতো হাজারো সাধারণ মানুষ তাদের ন্যূনতম নাগরিক সেবা থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হবেন।
ইতি
এক হাতিয়াবাসী




