সম্পাদকীয়
গুদামে খাদ্য পাতে হতাশা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ সাড়ে ২৩ লাখ টনে পৌঁছেছে— এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অর্জন। এত বড় সরকারি খাদ্যশস্য মজুদ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে এ মজুদ সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা দেবে। তবে খাদ্য মজুদের এ সাফল্যের পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস দামের চাপে বদলে যাওয়ার খবরও উদ্বেগের জন্ম দেয়। দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড় করালে একটি প্রশ্ন সামনে আসে— মজুদের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তার সুফল কি যথাযথভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
উত্তরাঞ্চলের অনেক পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে পুষ্টিকর খাদ্য কমিয়ে তুলনামূলক সস্তা খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে অনেকেই শুধু পেট ভরানোর খাবার বেছে নিচ্ছেন। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন নয়; দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্যও একটি সতর্কবার্তা। উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর রংপুর ও রাজশাহীর নিম্ন আয়ের মানুষ বাজারের সস্তা ও প্যাকেটজাত খাদ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি মাসে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই), ভারতের ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক গ্রোথ এবং নেপালের ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে গবেষণাটি।
সরকারি খাদ্য মজুদ বাড়ানো অবশ্যই প্রশংসার। কিন্তু খাদ্য মজুদের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যাবে এবং নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। শুধু গুদাম পূর্ণ থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন কার্যকর বণ্টনব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা। সুষম বণ্টনই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের চাবিকাঠি। এক্ষেত্রে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ‘খাদ্যের অভাবের চেয়ে বণ্টনব্যবস্থার ত্রুটিই দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ’ কথাটি গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখা দরকার।
অনেক সময় দেখা যায়, উৎপাদন এলাকা থেকে ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানোর পথে মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্যও দাম বাড়িয়ে দেয়। এসব সমস্যার কারণে সরকারি মজুদের ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
সাড়ে ২৩ লাখ টন রেকর্ড মজুদের সিংহভাগ আপৎকালীন বা সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য সংরক্ষিত। ফলে সরকারি গুদাম উপচে পড়লেও খোলাবাজারে চালের জোগান বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি মিলার ও বড় করপোরেট গ্রুপগুলো। খাদ্য মজুদকে আরও কার্যকরভাবে জনকল্যাণে লাগানোর মাধ্যমেই এ অর্জনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলসহ যেসব এলাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, সেখানে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিক্রির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদার করে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তাও যেন সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারেন— এমন ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে পুষ্টিনির্ভর খাদ্যনীতি প্রণয়নও জরুরি। শুধু চাল বা গমের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; মানুষের খাদ্যতালিকায় উন্নত ও পুষ্টিকর খাদ্যের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ খাদ্যনিরাপত্তা মানে শুধু ক্ষুধামুক্তি নয়, সুস্থ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন জীবন নিশ্চিত করা।
রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্যের মজুদ দেশ ও সরকারের সক্ষমতার প্রতীক। এখন প্রয়োজন সেই সক্ষমতাকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব হাতিয়ারে পরিণত করা। খাদ্যশস্য মজুদের প্রকৃত সাফল্য তখনই হবে, যখন দেশের কোনো অঞ্চলের মানুষকে মূল্যচাপের কারণে বাধ্য হয়ে খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হবে না।




