সম্পাদকীয়
রক্ষকই অরক্ষিত

পুলিশের প্রধান দায়িত্ব মানুষের জানমাল রক্ষা, অপরাধ দমন এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ সেই পুলিশেরই একজন সদস্য যদি বাহিনীর আঞ্চলিক কোনো পুলিশ সদর দপ্তরের মাত্র ৩০০ মিটার দূরে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন, কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় এবং তার কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক— নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনী নিজ সদস্যের নিরাপত্তাই যখন নিশ্চিত করতে পারছে না, তখন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা পাবে কোথায়?
খুলনা শহরের সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিছক একজন পুলিশ সদস্য ছিনতাইকারীর কবলে পড়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি পুলিশের কার্যক্রম নজরদারি, টহলব্যবস্থা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাস্থল খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সদর দপ্তরের খুব কাছে। অর্থাৎ, পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশেও যদি ছিনতাইকারীরা নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পারে এবং পুলিশ সদস্যকে জখম করে পালিয়ে যেতে পারে, তাহলে শহরের সাধারণ অলিগলি ও জনবহুল এলাকার নিরাপত্তার চিত্র কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই অনুমেয়।
ঘটনার পর পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাফেরা না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে— এ সিদ্ধান্তের মধ্যে একদিকে অসহায়ের স্বীকারোক্তি আছে, অন্যদিকে রয়েছে গভীর উদ্বেগের বার্তা। পুলিশ যদি নিজের সদস্যদেরই বলে, রাতে একা বের হবেন না, তাহলে সাধারণ নাগরিকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে— আমরা রাতে কোথায় যাব? কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীর স্বজন, নারী, জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া নাগরিকরা কার ওপর ভরসা করবেন?
পুলিশের ভাবমূর্তি শুধু ইউনিফর্ম, অস্ত্র কিংবা ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। পুলিশের বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। সেই পুলিশ সদস্যই যদি রাস্তায় আক্রান্ত হয়ে আহত হন এবং অপরাধীরা অর্থ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়, তাহলে জনমনে পুলিশের সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আরও বড় বিপদ হলো— অপরাধীরা যদি মনে করে পুলিশকেও আক্রমণ করা যায়, তাহলে তাদের দুঃসাহস আরও বাড়বে বৈ কমবে না। এর প্রভাব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ জাতীয় হামলা শুধু একজন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতার ওপরও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের ঘটনার তদন্তে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই।
পুলিশের ওপর হামলা নতুন নয়, তাই পুলিশের নিজ সদস্যদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। দায়িত্ব পালনের বাইরে ব্যক্তিগত চলাচলের সময় কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায় এবং স্থানীয় থানাগুলোর সঙ্গে কীভাবে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়— এসব বিষয়ে বাস্তবমুখী নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব মানুষকে ভয়মুক্ত রাখা। পুলিশের নিজের সদস্য যদি রাস্তায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আরও বাড়বে। পুলিশ যদি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে মানুষের নিরাপত্তা দেবে কীভাবে?
খুলনার ঘটনা শুধু ওই শহর বা জেলার পুলিশের নিরাপত্তা, সক্ষমতা ও ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়— এটা পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্য সতর্কসংকেতও। পুলিশের পোশাকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে ফিরিয়ে আনতে হবে মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা ফিরবে তখনই, যখন নাগরিক দেখবে— অপরাধী যত বড় হোক, আইনের হাত তার চেয়ে আরও বড়।



