সম্পাদকীয়
অভিযানের খবর আগে জানাজানি হয় কীভাবে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সময়োপযোগী এবং বাস্তবানুগ কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না। এটা শুধু ওই এলাকার বা দেশের বিশেষ কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি তা নয়, সব সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি কঠোর তৎপরতার ইঙ্গিত বলেই আমরা মনে করি। জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে এমন পদক্ষেপ এলাকা ও দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল আরও অাগে। দেরিতে হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ উদ্যোগ স্বস্তি বয়ে এনেছে জনমনে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর— একসময় যা ছিল অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, গত কয়েক দশকে তা রূপ নেয় এক আতঙ্কের জনপদে। পাহাড়ের গহিন অরণ্যকে ঢাল বানিয়ে সেখানে গড়ে ওঠে অপরাধের এক সাম্রাজ্য। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট তৈরি করে জঙ্গল সলিমপুরকে রীতিমতো ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক স্বতন্ত্রভূমি’তে পরিণত করেছে একটি চিহ্নিত ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্র। অবাক করার বিষয় হলো, এরা এতটাই বেপরোয়া ও দুঃসাহসী যে, সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও।
জঙ্গল সলিমপুরের মূল নিয়ন্ত্রক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত ভূমিদস্যু মোহাম্মদ ইয়াসিন। তাকে গ্রেপ্তারে গিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এরপর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মিলে যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়। আরেকটি ক্যাম্প গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই গত ২৫ মে রাতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দেয়। সন্ত্রাসীরা কি এতই শক্তিশালী যে, তারা রাষ্ট্রকে সরাসরি প্রতিপক্ষ বানাল বা এর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল!
আরও একটি প্রশ্ন, যৌথ বাহিনীর অভিযানের খবর আগে জানাজানি হয়ে গেল কীভাবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে যদি সন্ত্রাসীদের দোসর লুকিয়ে থােক তাহলে সেটা খুবই চিন্তার বিষয়। সরষের মধ্যে ভূতের এই চক্র নতুন কিছু নয়। কঠোর হাতে এসব চক্র দমন করা না গেলে সন্ত্রাসীদের হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নাজেহাল হতে হবে। একই সঙ্গে এ সন্ত্রাসীদের শক্তির উৎস বা অস্ত্রের ভাণ্ডার কোথায় সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। পাশাপাশি অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট ভাষায় এ বার্তা দেওয়া জরুরি যে, জঙ্গল সলিমপুর বাংলাদেশের মানচিত্রের বাইরের কোনো অংশ নয়। সেখানে অবশ্যই বাংলাদেশের আইন ও নিয়মকানুন চলবে। যারা মনে করেছিল পাহাড়ের আড়ালে তারা আজীবন আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে; তাদের এ দুঃস্বপ্ন অবসানের সময় এসেছে। জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের, ভূমিদস্যুদের এবং অপরাধীদের কোনো স্থান হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারিতে জনসাধারণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। কেননা বছরের পর বছর ধরে জঙ্গল সলিমপুরের যে আলীনগর ছিল অপরাধের মূল আস্তানা, সেটিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সন্ত্রাসীদের নিজস্ব বাহিনী, নিজস্ব ‘টর্চার সেল’ এবং বিচারহীনতার এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল সেখানে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান এবং বর্তমান প্রশাসনের আপসহীন মনোভাবের কারণে সেই দুর্ভেদ্য দুর্গে ফাটল ধরবে বলে আশা করা যায়। তবে স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে যদি তথ্য ফাঁসকারী থাকে তবে তাদের শনাক্ত করে অাইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অাগেভাগে এটা করতে পারলে সব অভিযানের সাফল্য আশা করা যায়।






