সম্পাদকীয়
বঙ্গভ্যাক্সের পরিণতি যেন না হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় ডেঙ্গু মৌসুমি রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এর প্রকৃতি বদলে গেছে। কমবেশি সারা বছরই ডেঙ্গুতে আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রাণহানিও থেমে নেই। ডেঙ্গুর চরিত্র ও লক্ষণেও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এতে সাধারণ মানুষের পক্ষে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আঁচ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। গত রবিবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ৯৮ এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। ফলে রোগটিকে আর সাময়িক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
তবে ডেঙ্গুর আতঙ্ক ও উদ্বেগের মাঝে স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে ডেঙ্গু টিকার ট্রায়াল। সোমবার দৈনিক আগামীর সময়ে ‘দেশে শুরু হচ্ছে ডেঙ্গু টিকার ট্রায়াল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ‘প্রোডেঙ্গা’নামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডেঙ্গুর টিকার পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) উদ্ভাবিত ডেঙ্গু টিকা তৈরির লাইসেন্স পেয়েছে দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস।
‘প্রোডেঙ্গা’মূলত এনআইএইচের ‘টিভি ০০৩’টিকা প্রযুক্তির বাংলাদেশি সংস্করণ। একই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘বুটানটান-ডিভি’টিকাটি ইতোমধ্যে ব্রাজিলে দারুণ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও সম্প্রতি ডেঙ্গু টিকার অনুমোদন দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও এই টিকার ট্রায়াল শুরু হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকায় ৩ হাজার ২২২ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর ডাবল-ব্লাইন্ড ও র্যান্ডমাইজড পদ্ধতিতে এই পরীক্ষা চালানো হবে, যার মূল লক্ষ্য ব্রাজিলের সফল টিকার তুলনায় এর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরির সামঞ্জস্য ও নিরাপত্তা যাচাই করা। বিশেষ করে বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় ডেনভি-২ ও ডেনভি-৩ ধরনের বিরুদ্ধে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
বাংলাদেশের মানুষ দশকের পর দশক ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করেছে, অপেক্ষা করেছে একটি টেকসই সমাধানের। ‘প্রোডেঙ্গা’র ট্রায়াল এদিক থেকে অবশ্যই ইতিবাচক। তবে ট্রায়ালের আগে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আরও গবেষণা করা যেতে পারে, যদি ইতোমধ্যে গবেষণা হয়ে থাকে তবে প্রাপ্ত তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। কারণ নতুন কোনো টিকা বাজারে এলে মানুষের ভেতর ভীতি কাজ করে। তাই প্রথমে জনমনের ভীতি দূর করতে হবে।
করোনা মহামারীর সময় আমরা দেখেছি, দীর্ঘসূত্রী অনুমোদনের প্রক্রিয়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অনাবশ্যক দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের তৈরি ‘বঙ্গভ্যাক্স’ করোনা টিকা যথাসময়ে বাজারে আনা সম্ভব হয়নি। ‘প্রোডেঙ্গা’র যেন এমন পরিণতি না হয় সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এবং এই উদ্যোগটিকে এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক সাহায্য করতে হবে।
‘প্রোডেঙ্গা’ যদি বাজারে আসে, সেক্ষেত্রে টিকার কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন রাখতে টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি স্তরে বিজ্ঞানভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ‘েপ্রাডেঙ্গা’ যেন শুধু ব্যবসায়িক পণ্য না হয়ে ওঠে সে বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া দরকার। বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক মহামারী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় ডেঙ্গুর এ টিকা বিনামূল্যে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। যদি একান্তই তা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে টিকার মূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।




