পাঠকের লেখা
বিতর্ক নয় বিষয়টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় সংগীত শিক্ষক নিয়োগ ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের শিক্ষা-দর্শন, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, সে মৌলিক প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত। কেউ এটিকে সৃজনশীল শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখছেন, কেউ অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মনে করছেন, আবার কেউ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি তুলছেন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিও আলোচনাকে অনেক ক্ষেত্রে মূল বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
আসলে প্রাথমিক শিক্ষা শুধু বর্ণমালা, গণিত কিংবা পরীক্ষার ফল শেখানোর বিষয় নয়। এ স্তরেই একটি শিশুর নান্দনিক বোধ, সামাজিক আচরণ, আত্মবিশ্বাস, দলগত কাজের মানসিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে। সংগীত সেই বিকাশের একটি কার্যকর মাধ্যম। গান শেখার ফলে যেমন মনোযোগ বাড়ে, তেমনি স্মৃতিশক্তি ও আবেগ প্রকাশের ক্ষমতারও বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন গবেষণায়ও বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে।
গান শেখার ফলে যেমন মনোযোগ বাড়ে, তেমনি স্মৃতিশক্তি ও আবেগ প্রকাশের ক্ষমতারও বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন গবেষণায় বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে
এটিও মনে রাখতে হবে, শুধু শিক্ষক নিয়োগ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না; যদি প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম ও বিদ্যালয়ে যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তবে এ উদ্যোগ কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই নিয়োগের পাশাপাশি এসব নিয়েও ভাবা জরুরি।
সংগীত নিয়ে ইসলামপন্থীদের কোনো কোনো মহলের বয়ানের বিষয়টিও সংবেদনশীল। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় মত ও সাংস্কৃতিক চর্চা যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করেছে। সংগীত নিয়ে ইসলামি চিন্তায়ও একক অভিমত নেই; ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও মত বিদ্যমান। ফলে একটি নির্দিষ্ট মতকে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ভিন্নমত পোষণকারীদের অবজ্ঞা করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা
ও সাংস্কৃতিক বিকাশ– উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
বাংলাদেশ এ মুহূর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এ সময় শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থী নয়; বরং সৃজনশীল, সহানুভূতিশীল, সংস্কৃতিমনস্ক এবং মানসিকভাবে সুস্থ নাগরিক গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাও সে লক্ষ্য পূরণের অন্যতম ভিত্তি। তাই সংগীত শিক্ষক নিয়োগকে আবেগ, গুজব কিংবা রাজনৈতিক প্রচারের বিষয় না বানিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। যুক্তি, গবেষণা এবং বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে দূরদর্শিতার পরিচয়। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের শ্রেণিকক্ষে, বিতর্কের মঞ্চে নয়।
লেখক : কবি ও লেখক, ফেনী




