বীমা কোম্পানিগুলো লুট হয়ে গেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলো জনগণের কাছে আস্থাহীনতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর পেছনে দায়ী ক্লেইম সেটেলমেন্টে বীমা কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের গড়িমসি। বিদেশি কোম্পানি তুলনামূলকভাবে বীমাগ্রহীতাদের দাবি পরিশোধ করতে পারলেও দেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর, মাসের পর মাস বীমাগ্রহীতাদের দাবি পরিশোধ করতে পারছে না।
তো, প্রশ্ন থেকে যায় যে যখন কোম্পানি বীমা পলিসি সেল করে এবং তার বিপরীতে পলিসি প্রিমিয়াম গ্রহণ করে, সেই প্রিমিয়ামগুলো তাহলে এতদিন তারা কোথায় বিনিয়োগ করে এসেছে? এদিক থেকে রেগুলেটরি অথরিটি যারা, তাদেরও কিন্তু তদারকির একটি দুর্বলতা ছিল; এ বিষয়ে কিন্তু প্রশ্ন তোলা যায়।
বীমা কোম্পানিগুলো যখন পলিসিহোল্ডারদের বীমা দাবি পরিশোধের নিমিত্তে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং এর বিপরীতে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে, তখন এটি কোম্পানির একটি নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে যে কালক্ষেপণ না করে পলিসিহোল্ডারদের বীমা দাবি পরিশোধ করা।
এখন বীমা দাবি পরিশোধ করতে অনীহা প্রকাশ করায় এ মুহূর্তে কিন্তু বীমাশিল্পের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই নেতিবাচক। বীমা কোম্পানিগুলো এখানে তছরুপ হয়েছে, লুটপাট হয়েছে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি আটকে রয়েছে। আর এই দাবি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
বীমা দাবি পরিশোধ করতে অনীহা প্রকাশ করায় এ মুহূর্তে কিন্তু বীমাশিল্পের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই নেতিবাচক। বীমা কোম্পানিগুলো এখানে তছরুপ হয়েছে, লুটপাট হয়েছে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি আটকে রয়েছে
একটি উদীয়মান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য টেকসই আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনা করলে বীমা বা ইন্স্যুরেন্স খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক ও টেকসই অর্থনীতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রধান হাতিয়ার হলো বীমা ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো উন্নত বা দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি মূলত চারটি শক্তিশালী আর্থিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে— পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট, ব্যাংকিং মার্কেট ও বীমা খাত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে এই চার খাতের সুষম বিকাশ ঘটেনি, বিশেষ করে বীমা খাতের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা বিপুলভাবে উপেক্ষিত ও অনগ্রসর রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ প্রায় ২০ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজার। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে এবং ২০৪১-৪২ সালের মধ্যে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামনে রয়েছে। তবে অর্থনীতি যত বড় হয়, মানুষের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদের পরিমাণ যত বাড়ে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অবকাঠামোগত বিকাশ, যানবাহন ও শিল্পায়ন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর বীমা কাভারেজ বা পরিষেবার কোনো বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্ব তো বটেই, এমনকি অনেক উদীয়মান অর্থনীতিতেও বীমাসেবা ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়; বহু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাংলাদেশে বীমা খাতের বর্তমান চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। ভবিষ্যতে কী হবে, তাও অনুমান করে বলা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক মানদণ্ড দূরে থাক, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায়ও আমাদের অবস্থান সর্বনিম্ন পর্যায়ে। উন্নত দেশগুলোতে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান থাকে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এমনকি অনেক প্রতিবেশী দেশেও এটি উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ৮০টির বেশি লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানি চালু থাকা সত্ত্বেও জিডিপিতে এই খাতের মোট অবদান শূন্য দশমিক ৪ শতাংশেরও নিচে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে এই খাতকে অন্তত ১০ গুণ বৃদ্ধি করে জিডিপির ৩ থেকে ৪ শতাংশের ঘরে উন্নীত করা জরুরি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশাল সম্ভাবনাময় এই খাত কেন পিছিয়ে রয়েছে? গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে বেশ কিছু কারণ চোখে পড়ে।
প্রথমত, বীমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত কাঠামোর দুর্বলতা। ২০১০ সালে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গঠন করা হলেও একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এটি আজও কাঙ্ক্ষিত রূপ লাভ করতে পারেনি। পর্যাপ্ত ও যোগ্য জনবলের অভাব, নিজস্ব স্থায়ী পরিকাঠামো বা সচিবালয়ের সীমাবদ্ধতা এবং অপ্রতুল বার্ষিক বাজেটের কারণে আইডিআরএ বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রভাবহীন সংস্থায় পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা ও বাজার তদারকির অভাবে এখানে ‘মার্কেট ফেইলিউর’ বা বাজার ব্যর্থতার চিত্র স্পষ্ট।
দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের চরম সংকট ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। একটি খাতের টেকসই বিকাশের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত শিক্ষা ও আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ। কিন্তু বীমা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ থাকলেও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘ইন্স্যুরেন্স স্ট্রিম’-এ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কম। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো চাকরির বাজারে এই খাতের কম আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যাংকিং খাতে একজন নতুন গ্র্যাজুয়েট যে প্রারম্ভিক বেতন বা সুবিধা পান, বীমা খাতে তার অর্ধেকেরও কম অফার করা হয়। ফলে মেধাবী ও দক্ষ তরুণরা এই খাতকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
বীমা খাতের বর্তমান সংকট কাটিয়ে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সরকারকে অবিলম্বে বীমা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপরেখা গ্রহণ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় শুধু সরকার একা নয়; বীমা কোম্পানিগুলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের মতো অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজে যুক্ত করতে হবে।
সংকট কাটিয়ে বীমা খাতকে আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষায়িত গবেষণা, জনবল তৈরি ও নীতি-পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারে। এর মাধ্যমে কার্যকর আইনি সংস্কার, বাজার তদারকি জোরদার, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদানুযায়ী বীমাসেবা প্রবর্তন করা গেলে বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স খাত তার প্রকৃত সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে এবং দেশের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




