ইসলামে নারী শিক্ষার অধিকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের ফলাফল বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলেও নারী শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য নতুন করে সেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাই মেয়েদের ভালো ফলাফলকে শুধু পরীক্ষার পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মৌলিক কিছু প্রশ্নের অনুসন্ধান প্রয়োজন। সেগুলো হচ্ছে— ইসলাম নারীকে শিক্ষিত হওয়ার কতটুকু অধিকার দিয়েছে? জ্ঞানচর্চায় নারীর অবস্থান কী? আর মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষিত নারীরা কী ভূমিকা রেখেছেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে জ্ঞান কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মর্যাদা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কোরআন নাজিলের প্রথম শব্দ— ‘ইকরা’, অর্থাৎ ‘পড়ো’। আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো তোমার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১) ওহির সূচনাতেই পড়া ও জ্ঞানের প্রতি আহ্বান ইসলামের জ্ঞানদর্শনের মৌলিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে।
জ্ঞানীদের মর্যাদা ঘোষণায় মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ (সুরা যুমার, আয়াত: ৯) আয়াতে নারী-পুরুষের পৃথক আলোচনা নেই; বরং জ্ঞানের মর্যাদাকে একটি সাধারণ মানবিক ও ইমানি মূল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নারীদের জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নারীরা নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে অভিযোগ করেছিলেন যে পুরুষরা তার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করেন এবং সেই দিনে তিনি তাদের উপদেশ ও শিক্ষা প্রদান করেন। (বুখারি, হাদিস: ১০১)
ঘটনাটি ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। নারীরা যখন জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন প্রকাশ করলেন, তখন তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়নি; বরং তাদের জন্য পৃথক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যাতে নবীজি (সা.) নারীর জ্ঞানচর্চাকে স্বীকৃতি দিয়ে বাস্তব সুযোগও তৈরি করে দিয়েছেন।
মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নারী কোনো প্রান্তিক দর্শক ছিলেন না; তারা জ্ঞান সংরক্ষণ, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের অংশ ছিলেন
ইসলামের ইতিহাসে নারীশিক্ষার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণের একটি আয়েশা (রা.)। তিনি শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন হাদিস, ফিকহ, কোরআনের ব্যাখ্যা, আরবি ভাষা ও চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞানে পারদর্শী একজন বিশিষ্ট শিক্ষিকা।
উরওয়া ইবনে যুবাইর (রহ.) বলেছেন, তিনি আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে কোরআন, ফরজ বিধান, হালাল-হারাম, কবিতা, আরবদের ইতিহাস ও বংশপরিচয় এবং চিকিৎসাবিদ্যায় বেশি জ্ঞানী কাউকে দেখেননি। (আল-ইস্তিআব ফি মা‘রিফাতিল আসহাব, ৪/১৮৮৫; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ২/১৮১)
তার জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গ্রহণযোগ্যতার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায়। আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেছেন, আমাদের, অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের কাছে কোনো হাদিসের অর্থ বোঝা কষ্টসাধ্য হলে আয়েশা (রা.)-কে প্রশ্ন করে তার নিকট এর সঠিক জ্ঞাত লাভ করেছি। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৮৩)
ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারী জ্ঞানীদের মধ্যে উম্মুদ দারদা (রহ.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন তাবেঈ যুগের একজন বিদুষী ও ফকিহ। দামেস্কে তার কাছে বহু মানুষ জ্ঞান অর্জন করতেন। ইমাম বুখারি ‘আত-তারিখুল কাবির’-এ তার উল্লেখ করেছেন। এভাবে ইসলামি ইতিহাসে এমন বহু নারী ছিলেন, যারা জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যদের শিক্ষা দিয়েছেন। ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.) বিভিন্ন নারী মুহাদ্দিসার জীবন ও তাদের কাছ থেকে পুরুষ আলেমদের হাদিস গ্রহণের তথ্য সংরক্ষণ করেছেন। (আত-তারিখুল কাবির, ৮/৩৪১; ইবনে হাজার আল-আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনা, ৪/২৭৩-২৭৪)
মুসলিম জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে নারীকে শুধু শিক্ষার্থী করে রাখা হয়নি। যোগ্য হলে তিনি শিক্ষক ও জ্ঞান প্রদানকারী হিসেবেও মর্যাদা পেয়েছেন।
হাদিসের চর্চাতেও নারীদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবি যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বহু নারী হাদিস বর্ণনা করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের হাদিস শিক্ষা দিয়েছেন। ইমাম যাহাবি, ইবনে হাজাতের মতো জীবনীকাররা তাদের নাম সংরক্ষণ করেছেন।
পরবর্তী শতাব্দীতে আমরাত আল-আওদিয়্যা, আমরাত আল-হামদানিয়্যা, ফাতিমা আল-ফিহরি এবং শুহদাহ আল-কাতিবাহসহ বিভিন্ন নারীর জ্ঞানচর্চার কথা মুসলিম ঐতিহাসিক ও জীবনীকারদের গ্রন্থে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে শুহদাহ আল-কাতিবাহ বিশেষভাবে হাদিস শিক্ষা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। (ওয়াফায়াতুল আ‘ইয়ান, ২/৪৮৯; আদ-দুরারুল কামিনা, ২/২৬২)
অতএব, মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নারী কোনো প্রান্তিক দর্শক ছিলেন না; তারা জ্ঞান সংরক্ষণ, শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের অংশ ছিলেন।
নারী যখন মা, স্ত্রী, কন্যা, শিক্ষিকা, চিকিৎসক, গবেষক, প্রশাসক কিংবা সমাজের অন্য কোনো দায়িত্বশীল ভূমিকায় থাকেন, তখন তার জ্ঞান ও দক্ষতা দায়িত্ব পালনে সহায়ক হয়। ইসলামের ইতিহাসে নারী জ্ঞানীদের উপস্থিতি অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে জ্ঞানচর্চাকে নারীর জন্য নিষিদ্ধ বা অপ্রয়োজনীয় মনে করা ইসলামের ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসএসসি পরীক্ষায় মেয়েদের ভালো ফলাফল নিঃসন্দেহে তাদের অধ্যবসায় ও সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই সাফল্যকে আরও অর্থবহ করতে হলে শুধু ফলাফলের দিন অভিনন্দন জানালেই হবে না। তাদের জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং তাদের প্রতিভাকে সমাজ ও মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ আয়েশা (রা.)-এর জ্ঞানচর্চা থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের নারী মুহাদ্দিসাদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম নারীর জন্য জ্ঞানের দরজা কখনো শুধু দর্শকের দরজা ছিল না; তা ছিল অবদান রাখারও দরজা।
আজ যখন মেয়েদের পরীক্ষার ফল নিয়ে আমরা আলোচনা করি, তখন প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়— ‘মেয়েরা কত ভালো ফল করেছে?’ বরং আরও বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত— ‘এই জ্ঞান তারা কীভাবে নিজের, পরিবার, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজে লাগাবে?’
মেয়েদের ভালো ফলাফল আমাদের সামনে একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। সেই দরজা দিয়ে যদি জ্ঞানী, নৈতিক, দক্ষ ও মানবিক প্রজন্ম বেরিয়ে আসে, তবে নারী শিক্ষার সাফল্য শুধু একটি পরিবারের নয়; সমাজেরও সাফল্য হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






