সোনা নয় তত খাঁটি

জাগতিক ধনসম্পদে অনাসক্তি ভর করলে বলি ‘টাকা মাটি মাটি টাকা’। টাকাকে এখানে মাটির সঙ্গে তুলনা করা হয় ‘মূল্যহীন’ বোঝাতে। আধ্যাত্মিক-ইকোনমি বলে কিছু থাকলে এসব কথা মানা যায়। কিন্তু ধরুন, ম্যাক্রো-অর্থনীতিতে শ্রীরামকৃষ্ণের এই বচন একেবারেই খাটে না। অন্তত কৃষিপ্রধান দেশে মাটিকে মূল্যহীন ভাববার সুযোগই নেই। মাটিকে দাম দিতে শিখলে যে একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় কত বড় ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া যায়, সেটি চীনে এলে দেখা যাবে।
চীনের মোট ভূখণ্ডের (প্রায় ৯৬ কোটি হেক্টর) মাত্র ১৩ শতাংশ চাষ্যযোগ্য জমি। আবার চীনে যে চাষযোগ্য জমি আছে, তা বিশ্বের মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র ৯ শতাংশ। অথচ এই চীনেই বছরে গড়ে উৎপাদিত হচ্ছে পৃথিবীর শস্য উৎপাদনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ! অর্থাৎ ৯ শতাংশ কৃষিজমি দিয়েই চীন বিশ্বের প্রতি পাঁচজনে একজনের ক্ষুধা মেটাচ্ছে।
এ সাফল্যের রহস্য কিন্তু সেই মাটিতেই। চীনে কৃষিজমি মানে সম্পদ। সেই সম্পদের দেখভাল করা হয় সরকারি উদ্যোগে। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখার কৌশল নিয়ে নিয়মিত মাঠে-বাগানে যান বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী। সার ও সেচের সব ব্যবস্থাপনাও করা হয় পরিকল্পিত কাঠামোর আওতায়।
চীনের অনেক এলাকায় আছে বিশেষ এক উর্বর কালো মাটি, যাকে বিশ্ব চেনে ব্ল্যাক সয়েল নামে। হিউমাস বা জৈব গুণে সমৃদ্ধ সেই মাটির জন্য চীন সরকার যেসব প্রচেষ্টা ও প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেসব জানলেই দেশটিতে মাটির সম্মান কতটা তা আঁচ করা যাবে।
চীনের সবচেয়ে দামি ও সংরক্ষিত প্রাণীটি হলো পাণ্ডা। সেই পাণ্ডার সঙ্গে মিল রেখে হেইলংচিয়াং, চিলিন, লিয়াওনিং প্রদেশ এবং ইনার মঙ্গোলিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের উর্বর কালো মাটির আরেক নাম রাখা হয়েছে ‘কৃষিজমির জায়ান্ট পাণ্ডা।’
সারের সংকট কাটানোর সহজ সমাধান অতিরিক্ত সার আমদানি নয়; বরং মাটিকে ‘ডিম পাড়া হাঁস’ বিবেচনা করে সেটার স্বাস্থ্য নিয়ে সচেষ্ট থাকা
একটা সময় মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার হতো চীনে। যথারীতি জমি ক্ষয়ে যাচ্ছিল, অ্যাসিডিক হয়ে পড়ছিল এবং মাটির শক্ত ভাবও বেড়ে যাচ্ছিল। এ সংকট কাটাতে কোমর বেঁধে লাগে চীনের বিজ্ঞান একাডেমি।
একাডেমির উদ্যোগে ২০২১ সালে শুরু হয় ‘কালো মাটির গোলাঘর’ নামের একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পে স্যাটেলাইট ও ড্রোন ব্যবহার করে চীনের বিজ্ঞানীরা মাটির জৈব উপাদান, অম্লতা ও ক্ষয়প্রাপ্ত অঞ্চলের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করে ফেলেন।
বারবার একই ফসল চাষ করলে মাটির গুণাগুণ কমতে থাকে। এ চিন্তায় চীনের কৃষকদের বলা হলো কালো মাটি বাঁচাতে হলে সেখানে চক্রাকার চাষ-পদ্ধতিতে যেতে হবে। কৃষিবিদদের কথামতো শুধু ভুট্টা চাষ না করে সেখানকার কৃষকরা সয়াবিন, জোয়ার, গম ও সরিষার পর্যায়ক্রমিক চাষ শুরু করে দিলেন। খাটো ও ঘন জাতের ফসল ব্যবহার করে মাটির উপরিভাগের বায়ু ও পানিজনিত
ক্ষয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল এতে।
প্রাকৃতিক কালো মাটি বহু বছরে গড়ে ওঠে। কিন্তু সেটার সঙ্গে যদি উর্বর মাটির পরিমাণ বাড়ানো যায়, সেই সৎসঙ্গে কালো মাটির স্বাস্থ্যও ঠিকঠাক থাকবে। সেই ভাবনা থেকে মাটিতে জৈব উপাদান বাড়ানোর চিন্তাও করা হলো।
এখানেও এগিয়ে এসেছে কৃষিবিজ্ঞান। গবাদি পশুর মলমূত্র সরাসরি জমিতে না ফেলে অ্যানেরোবিক প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করে পচিয়ে বানানো হলো উচ্চমানের জৈব সার। সেটার সঙ্গে যুক্ত করা হলো খড় ও বায়োচার নামের জৈব উপাদান। বায়োচার হলো সূক্ষ্ম কণাযুক্ত, ছিদ্রযুক্ত ও কার্বনসমৃদ্ধ একধরনের পদার্থ, যা দেখতে সাধারণ কাঠকয়লার মতো। এটি মাটির গুণমান বাড়ানোর সহায়ক উপাদান।
এভাবে কালো মাটি রক্ষার ফল চীন যে এখন পাচ্ছে, তা তো আগের পরিসংখ্যানেই পরিষ্কার। এখন চীনের মতো চাইলে কৃষির মানচিত্র বদলাতে পারে বাংলাদেশও। মাটির উর্বরতায় সরাসরি জৈব উপাদানে নজর দিলে সার সংকটের এ দুঃসময়ে কিছুটা স্বস্তি আসবেই। সেই সঙ্গে মানুষও পাবে বিষমুক্ত খাবার।
চীনের মতো কালো মাটি সেই অর্থে আমাদের হয়তো নেই। তবে আমাদের বদ্বীপ অববাহিকা অঞ্চলের বেশিরভাগ জমিতে আছে পলিসমৃদ্ধ মাটি। স্থানভেদে নানা ধরনের উর্বর মাটিও আছে সিলেট, পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এসব মাটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে পারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। উর্বর জমির মানচিত্র তৈরি করা যায়। আবার সেগুলোকে বিশেষভাবে সংরক্ষণের জন্য নেওয়া যেতে পারে প্রশিক্ষণ উদ্যোগ।
কৃষিজমি ফেলে রাখা বা ওপরের স্তরের মাটির ব্যবহার নিয়ে দেশে আইন আছে। কিন্তু মাটির উর্বরতা শক্তি বা জৈবগুণ বৃদ্ধি নিয়ে তেমন কিছু শোনা যায় না। সার সংকটের কথা এতটা ফলাও করে প্রচার হয় যেন, ফসল ফলাতে মাটির কোনো কাজই নেই, সারই সব।
কিন্তু এককালীন কিছু উদ্যোগ নিয়ে মাটির গুণমান বাড়িয়ে প্রাকৃতিক উর্বরতা ধরে রাখতে পারলে এর লাভ পাওয়া যাবে বছরের পর বছর। চীন যেমন গবাদি পশুর বিষ্ঠা, খড় ও বায়োচার প্রক্রিয়াজাত করে জমিতে দিয়ে ইউরিয়ার ব্যবহার কমিয়েছে শতকরা ৩০ ভাগ, তেমনি বাংলাদেশে গড়ে ওঠা হাজার হাজার ডেইরি ও পোলট্রি ফার্মের বর্জ্য পচিয়ে বাণিজ্যিক জৈবসার এবং ফার্মেন্টেড অর্গানিক ফার্টিলাইজারও কমাতে পারে রাসায়নিক
সারের চাহিদা।
কৃষকসহ সবাই যাতে মাটির জৈবিক গুণমান রক্ষার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে, এজন্য চীনে ২০২২ সালের ১ আগস্ট ঘোষণা করা হয় কালো মাটি সুরক্ষা আইন। আমাদের উর্বর মাটি সংরক্ষণে আপাতত আইনের কড়াকড়ি নয়, দরকার সুদূরপ্রসারী সাশ্রয়ী পরিকল্পনা।
গৃহস্থালী বা জৈব বর্জ্যের কোন উপাদানটি কীভাবে জমিতে ব্যবহার করতে হবে, সেসব নিয়ে দেখা যায় শহরের শখের ছাদবাগানিদের ভালোই জানাশোনা আছে। সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে হবে গ্রামের কৃষকদের মধ্যে। তখন কেউ আর প্রাকৃতিকভাবে উর্বর জমিতে যেনতেনভাবে সার-কীটনাশক ছিটাবে না। মাটির জৈবিক গুণ বিকাশে যে সাশ্রয় ও বাড়তি ফলন হবে, সেটার প্রভাবও জ্যামিতিক। একজনের দেখাদেখি আরও তিনজন বুঝবে, মাটি এমন এক স্থায়ী সম্পদ, যার যত্ন নিলে বিনিময়ে আসবে আরও টাকা।
চীনের কালো মাটি সংরক্ষণ চেষ্টার সুফল শুধু চীন পায়নি। পেয়েছে গোটা বিশ্ব। কারণ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ১২ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কীটনাশকের ব্যবহারও কমেছে ৩০ শতাংশ। বিপরীতে ফলন বেড়েছে ৬ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত।
এবার আসি সেচ প্রসঙ্গে। কালো মাটির মতো চীনের কৃষিতে জোর দেওয়া হয় সার-পানির সমন্বিত ব্যবস্থায়ও। এতে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা পদ্ধতিতে সেচের পানিতে মিশিয়ে দেওয়া হয় সার।
সনাতন পদ্ধতিতে জমিতে ঢালাও সেচ দিলে বা হাত দিয়ে সার ছিটালে সারের বড় একটি অংশ অপচয় হয় এবং মাটির নিচে ধুয়ে যায়। কিন্তু চীন ড্রিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে গাছের গোড়ায় সরাসরি তরল সারের ফোঁটা পৌঁছে দেয়। এই স্মার্ট ব্যবস্থায় সেচের পানির সাশ্রয় হয়েছে ২০ শতাংশের বেশি এবং সার সাশ্রয় ১০ শতাংশের বেশি। কমেছে কৃষকের পরিশ্রমও।
চীনের শানতোং প্রদেশের তেচৌ শহরে চালু হয়েছে সার ও পানির সমন্বিত প্রযুক্তি। এখানকার যেসব কৃষক ছোট জমিতে চাষ করেন, তাদের জন্য ছোট আকারের ‘মোবাইল ড্রিপ সেচ যন্ত্র’ দেওয়া হয়েছে। ৩০ থেকে ৫০ বিঘা জমিতে সহজে পানি ও সার দেওয়া যায় এ ব্যবস্থায়।
চীনের মতো তরল সার মেশানো ড্রিপ সিস্টেম স্থাপনে আমাদের কৃষকদেরও দেওয়া যেতে পারে ৫০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকি। আবার কৃষক যাতে বাজারের চিন্তা না করেই নিশ্চিন্তে চক্রাকার পদ্ধতির ফসল বিশেষ করে ডালজাতীয় ফসল চাষ করতে পারে, এজন্য সরকারিভাবে ফসল কেনা ও বীমা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কেননা, এ ধরনের ফসল প্রাকৃতিক উপায়ে মাটিতে নাইট্রোজেন ধরে রাখে, যা পরে ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
আবার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গ্রামে সরাসরি কৃষকদের জমিতে গবেষণার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। চীনে ঠিক এ কাজটিই করে থাকে শিক্ষার্থীরা। দেশটির শেখানো ফর্মুলায় এখন অ্যাঙ্গোলা, কেনিয়া, মালাওর মতো আফ্রিকার অনেক দেশের শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে যায় গ্রামাঞ্চলে। হাতে-কলমে যেমন শেখা হচ্ছে, তেমনি কৃষকরাও জানতে পারছেন নতুন কিছু।
চীনের এ কালো মাটি ও ড্রিপ সেচের অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে— সারের সংকট কাটানোর সহজ সমাধান অতিরিক্ত সার আমদানি নয়; বরং মাটিকে ‘ডিম পাড়া হাঁস’ বিবেচনা করে সেটার স্বাস্থ্য নিয়ে সচেষ্ট থাকা।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা




