তাপদগ্ধ নগর ও ইসলামের সতর্কবার্তা

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ১৯৭২ সাল থেকে এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে পালন করে আসছে। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব আয়োজনের বাইরে বাস্তব পরিবেশ পরিস্থিতি কতটা বদলেছে?
বিশেষ করে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। এখানে শহর মানে সবুজ, খোলা আকাশ বা জলাশয়ের সমাহার নয়; বরং ইট, কংক্রিট ও কাচে মোড়ানো এক ঘন নগরী। ঢাকা শহর একসময় খাল, মাঠ ও গাছপালায় ভরা ছিল; সেখানে আজ উঁচু ভবন, সড়ক সম্প্রসারণ ও অবকাঠামোগত চাপ সবুজকে ক্রমে সংকুচিত করে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন নগর পরিবেশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ তৈরি করে, যেখানে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় ২ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে। ঢাকা শহরে এই পার্থক্য অনেক সময় আরও বেশি অনুভূত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় জলাভূমি, খোলা জায়গা ও সবুজ এলাকা বিগত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে কমেছে। একই সঙ্গে বায়ুদূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বায়ুমান সূচকে ঢাকা বারবার বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসছে। যা শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বায়ুদূষণ প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ। দীর্ঘ মেয়াদে এটি হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়। আমরা জানি, ইসলাম পরিবেশকে শুধু ভৌত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে না; ইসলামের দৃষ্টিতে এটি মানুষের জন্য আল্লাহর সৃষ্টি একটি আমানত। পবিত্র কোরআনে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার ব্যাপারে বলা হয়েছে— ‘তিনি আকাশকে উঁচু করেছেন এবং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত: ৭)
এ ভারসাম্য ধারণাটি শুধু আধ্যাত্মিক নয়, এটি পরিবেশগত শৃঙ্খলার প্রতীকও। মানুষ যখন এ ভারসাম্য নষ্ট করে, তখন তার ফল ভোগ করতে হয় মানবজাতিকেই।
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় মানুষের কৃতকর্মের কারণে প্রকাশ পেয়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)
ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে বলেছেন, ‘মানুষের অন্যায়, অপচয় ও সীমালঙ্ঘন পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ।’ এটি শুধু নৈতিক ব্যাখ্যা নয়; বরং সামাজিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যাখ্যা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও পরিবেশ রক্ষার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেছেন এবং একে সদকার মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি গাছ রোপণ করে, তা থেকে মানুষ বা প্রাণী উপকৃত হলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৫৫২)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও পরিবেশ রক্ষার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেছেন এবং একে সদকার মর্যাদা দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি গাছ রোপণ করে, তা থেকে মানুষ বা প্রাণী উপকৃত হলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৫৫২)
আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘যদি কেয়ামত এসে যায় এবং তোমাদের হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সম্ভব হলে সেটি রোপণ করো।’ (আহমদ, হাদিস: ১২৯০২)
এ নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, পরিবেশ রক্ষা ইসলামে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইবাদতেরও অংশ।
পানির অপচয় রোধে নবী (সা.) ওজুর সময়ও অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, শহরে গাছপালা কমে গেলে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ কমে যায়, অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয় এবং তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। গাছপালা শুধু ছায়া দেয় না; বরং মাটি ধরে রাখে, বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং বায়ু পরিশোধন করে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, শহরের সবুজ এলাকা ১০ শতাংশ কমে গেলে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। নগর সবুজায়ন তাই শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি সরাসরি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের অংশ।
বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ রক্ষায় বেশ কিছু আইন ও নীতি গ্রহণ করেছে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (পরবর্তী সংশোধনীসহ) দূষণ নিয়ন্ত্রণে মূল আইনগত ভিত্তি। এ ছাড়া বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে।
ঢাকার জন্য ‘ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)’ এবং বিভিন্ন নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলাশয় ও খোলা জায়গা সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহরতলিতে গাছ লাগানোর উদ্যোগও চলছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবৈধ দখল, দুর্বল মনিটরিং এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। ফলে নীতি থাকলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়।
প্রতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। র্যালি, সেমিনার, গাছ বিতরণ, সামাজিক প্রচারণা— সবই হয়। গণমাধ্যমেও উঠে আসে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব উদ্যোগ অনেক সময় প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। শহরের সবুজ হারিয়ে যাওয়ার যে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা, তা থামানোর মতো কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো দুর্বল।
কংক্রিটের এ নগরে সবুজ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু গাছ কমে যাওয়া নয়; বরং মানুষের জীবনমান, স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তি হারিয়ে যাওয়া। ইসলাম, বিজ্ঞান এবং আধুনিক নীতি বিশ্লেষণ এক জায়গায় এসে একই বার্তা দেয়; প্রকৃতি রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানব অস্তিত্বের শর্ত।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই শুধু একটি দিন নয়; বরং এটি একটি সতর্কতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই সবুজ ফিরিয়ে আনার পথে হাঁটছি, নাকি ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি দিনকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি?
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




