তবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। যদিও জায়গাটার নাম বাসস্ট্যান্ড; তবে বাসগুলো থামছে না ঠিকমতো। না থামলেও দোষ অবশ্য তাদের দেওয়া যায় না। কারণ ঢাকা শহরে বাসস্ট্যান্ড বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। আবার পুরো শহরটাকেই চালিয়ে নেওয়া যায় বাসস্ট্যান্ড হিসেবে। অফিস শেষে বাসায় যাব, কিন্তু বাসায় আর যাওয়া হচ্ছে না। শুধু রাস্তা দিয়ে ছুটে চলা বাসগুলো দেখা হচ্ছে। বাসে উঠতে পারব কি না, তা-ও বুঝতে পারছি না।
সবকিছু এলোমেলো। এই শহরে বাস কোথায় থামবে, সেটা বাসস্ট্যান্ড ঠিক করে না। ঠিক করেন চালক। আর চালক কী করবেন সেটা সম্ভবত জানেন না তিনি নিজেও। তাই আমি শান্ত দাঁড়িয়ে আছি। হুড়োহুড়ি করছি না। ভালো করেই জানি, দাঁড়িয়ে থাকাটা আমার দায়িত্ব। কারণ দৌড়ানোর সিদ্ধান্তটা আমার না। সিদ্ধান্তটা বাসের। বাস যদি একটু সামনে থামে, আমি দৌড়াব। আর যদি আরও সামনে থামে, আরও জোরে দৌড়াব।
কীভাবে বাসে উঠব, সেটাই ভাবছি। অফিস ছুটির সময় দৌড়াদৌড়ি হয়। কিন্তু আজ পরিস্থিতি মনে হয় আরও খারাপ। চোখে পড়ছে বাসকে কেন্দ্র করে এদিক-সেদিক ছোটাছুটির দৃশ্য। এটিকে দৌড় প্রতিযোগিতাও বলা যায়— ঢাকা মহানগর বাসযাত্রী দৌড় প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা শুধুই বাসযাত্রী। যারা দূর থেকে বাসের দেখা পেলেই শুরু করেন দৌড়।
এক ভদ্রলোক দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করলেন, ‘লাইন দেন ভাই, লাইন দেন! সবাই লাইন ধরে বাসে ওঠেন। সিস্টেম তো মানতে হবে নাকি!’
কথাটা কেউ শুনল বলে মনে হয় না। শুনলেন না তিনি নিজেও। দৌড়াতে লাগলেন ঊর্ধ্বশ্বাসে। লাইনের ধারণাকে পেছনে ফেলে দুর্বার গতিতে চলে গেলেন সবার সামনে। আমাদের দেশে লাইনের ধারণা আছে, কিন্তু লাইন নিজেই নেই। ঢাকায় একসময় যাত্রীরা লাইন ধরে বাসে উঠত। টিকিট কেটে লাইন ধরাটাই ছিল তখন নিয়ম। এতে নারী, শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ— সবাই সুযোগ পেত বাসে ওঠার। বাসও দাঁড়িয়ে থাকত না। যাত্রী ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিত। অথচ সবকিছুই এখন অতীত।
সবচেয়ে মজার দৃশ্যটা ঘটে বাস থামার পর। বাসে আর জায়গা নেই। তবু জায়গা আছে কন্ডাক্টরের চোখে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষও বিশ্বাস করে, উঠে যাওয়া যাবে কোনো না কোনোভাবে। যাত্রীতে উপচে পড়া বাসেও মানুষ ঢুকছে ঠেলেঠুলে। পদার্থবিজ্ঞানে একটা কথা আছে— কোনো বস্তুকে জোর করলে একসময় আর সংকুচিত করা যায় না। আমার ধারণা, লোকাল বাসের ভেতরে এই সূত্র কাজ করে না। এখানে আছে আলাদা একটা বিজ্ঞান। বাইরে যে মানুষটির প্রস্থ দেড় ফুট, বাসের ভেতরে তিনি হয়তো হয়ে যান তিন ইঞ্চি।
আমি বাসে ওঠার প্রস্তুতি নিলাম। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে বাসায় আর যাওয়া হবে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, ঢাকার বাসগুলো আসলে যানবাহন না, চরিত্র গঠনের শিক্ষক। তারা আমাদের ধৈর্য শেখায়, দৌড় শেখায়, ধাক্কা খেয়েও হাসতে শেখায়। শুধু একটা জিনিস শেখায় না— কীভাবে বাস ব্যবহার করতে হয়।




