অপরিকল্পিত নগরায়ণই জলাবদ্ধতার মূলে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল, বিল, জলাশয় ও নিচু এলাকা ছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের নামে এসব জলাধার ধীরে ধীরে ভরাট করা হয়েছে। আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা অবৈধ দখলের কারণে পানি ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ হারিয়ে ফেলেছে।
এ ছাড়া বহু খাল সংকুচিত হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও খালের ওপর স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ কিংবা বক্স কালভার্ট তৈরির ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একসময় যে খালগুলো শহরের পানি নদীতে নিয়ে যেত, সেগুলো এখন কার্যত মৃত। ফলে বৃষ্টি হলেই পানি আটকে থাকে শহরের বুকেই।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ। বহু এলাকায় ড্রেনের ধারণক্ষমতা বর্তমান জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপের তুলনায় অনেক কম। অনেক ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। প্লাস্টিক, পলিথিন, নির্মাণবর্জ্য এবং গৃহস্থালি আবর্জনায় ড্রেন ভরে যায়। পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গেলে সামান্য বৃষ্টিতেও তা উপচে পড়ে সড়কে। এক্ষেত্রে শুধু কর্তৃপক্ষকে দায়ী করলেই হবে না, নাগরিকদেরও সচেতনতার অভাব রয়েছে। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, ড্রেনে প্লাস্টিক ও ভরি বর্জ্য ফেলা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। একটি শহরকে বাসযোগ্য রাখতে যেমন দক্ষ প্রশাসন প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্বশীল নাগরিকও অপরিহার্য।
ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব একসময় ওয়াসার অধীনে থাকলেও পরে তা দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দায়িত্ব হস্তান্তর করলেই দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা তৈরি হয় না। প্রয়োজন ছিল দক্ষ প্রকৌশলী, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, সমন্বিত ডেটাবেইস এবং শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো। এসবের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। ফলে দায়িত্ব বদলেছে; কিন্তু দুর্ভোগের চিত্র বদলায়নি।
একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল, বিল, জলাশয় ও নিচু এলাকা ছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করত। কিন্তু নগর সম্প্রসারণের নামে এসব জলাধার ধীরে ধীরে ভরাট করা হয়েছে
বিশ্বের অনেক দেশ জলাবদ্ধতার সমস্যার সফল সমাধান করেছে। তারা জলাধার সংরক্ষণ, রেইনওয়াটার হারভেস্টিং, পারমিয়েবল পেভমেন্ট, আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার, স্মার্ট ড্রেনেজ মনিটরিং এবং আধুনিক পাম্পিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান গ্রহণ করা সম্ভব।
তবে সবকিছুর আগে রাজধানীর সব খাল ও জলাশয়কে দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। যেসব খাল এখনো টিকে আছে, সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। কোনো জলাধার ভরাট হলে তা দখলমুক্ত করে আবার খনন করার বিষয়েও ভাববার সময় এসেছে। এ ছাড়াও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানকে সময়োপযোগী করে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতির বিষয়ে জনগণের উদ্দেশ্যে নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যেসব এলাকায় নিয়মিত পানি জমে, সেখানে বিশেষ নজর দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি ও পয়োনিষ্কাশনের লাইন সম্পূর্ণ আলাদা করতে হবে। এতে জলাবদ্ধতা যেমন কমবে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
একটি আধুনিক রাজধানীর পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা দিয়ে হয় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষ নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে ঢাকা এখনো অনেক পিছিয়ে।
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে জবাবদিহিমূলক নগর শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। জলাবদ্ধতাকে ভাগ্যের লিখন হিসেবে মেনে নেওয়ার সময় শেষ। এটি সমাধানযোগ্য একটি প্রকৌশলগত ও প্রশাসনিক সমস্যা। প্রয়োজন শুধু সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং অবিচল রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
রাজধানীর মানুষ নিয়মিত কর দেন, বিভিন্ন সেবার জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেন। বিনিময়ে তারা একটি নিরাপদ, সচল ও বাসযোগ্য শহর প্রত্যাশা করেন। সে প্রত্যাশা পূরণ করা রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। উন্নয়নের স্লোগান তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন বর্ষার এক পশলা বৃষ্টিতে রাজধানী থমকে দাঁড়াবে না।
লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়




