যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্ব অস্থিরতার মুখে ইউরোপ
- তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি আর দূরের আশঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ, সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপের রাজপথে বিক্ষোভ, সংঘাত, সহিংসতা— সব মিলিয়ে পৃথিবীর উঠান ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, তাইওয়ান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের উত্তেজনা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ইউরোপের মানুষের ক্ষোভ থেকে দাঙ্গা, ভাঙচুর, লুটপাট একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে— বিশ্ব কি নতুন কোনো মহাসংঘাতের দিকে এগোচ্ছে?
একসময় ইউরোপকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোকে ভাবা হতো তুলনামূলক নিরাপদ অঞ্চল। পূর্ব এশিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো আন্তর্জাতিক আলোচনার বড় অংশ; কিন্তু সেই পরিচিত বিশ্ব এখন বদলে যাচ্ছে। কোথাও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা, কোথাও সীমান্তে সেনা সমাবেশ, কোথাও যুদ্ধের বিস্তার, আবার কোথাও দ্রব্যমূল্যের চাপে ক্ষুব্ধ মানুষের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ। সব মিলিয়ে শান্তির নিশ্চয়তা ক্রমেই ফিকে হচ্ছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করে, তখন অনেকের কাছেই ঘটনাটি ছিল অবিশ্বাস্য। আধুনিক ইউরোপে আবারও এত বড় যুদ্ধ হতে পারে— এই ধারণা সহজে মেনে নিতে পারেননি কেউ কেউ। অথচ যুদ্ধের আগে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা রুশ হামলার আশঙ্কা স্পষ্ট করেছিলেন। বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করে।
সেই ঘটনার শিক্ষা শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়। যুদ্ধের ঝুঁকি এড়িয়ে চললেই যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া যায় না; বরং সম্ভাব্য বিপদকে অবিশ্বাস করা, প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য ভুলভাবে বোঝা কিংবা নিরাপত্তার নিশ্চয়তাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর দুটি দেশের সীমান্তসংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর কোরিয়ার সেনাদের রুশ বাহিনীর পক্ষে অংশগ্রহণ, ইরান ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের সঙ্গে মস্কোর কৌশলগত সম্পর্ক সংঘাতটির আন্তর্জাতিক মাত্রা বাড়িয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও বৃহৎ শক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ইউক্রেনের ড্রোন প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাজে লাগার সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে, কীভাবে একটি যুদ্ধের সামরিক শিক্ষা অন্য অঞ্চলের সংঘাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং তাইওয়ানকে শক্তি প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি সংঘাত এখনো ঘটেনি; কিন্তু তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো সামরিক সংকট তৈরি হলে তা শুধু এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখনকার দিনে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার চাপ শুধু সীমান্তে, যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা সামরিক সদর দপ্তরে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের পাশাপাশি ইউরোপের ভেতরেও অস্থিরতার নতুন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
আলজাজিরার গত ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট এবং শিক্ষার খরচ নিয়ে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রান্সে সাড়ে ৫ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। ইতালির মিলান ও বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও আবাসন সংকট, বাড়িভাড়া ও কম মজুরির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। প্রতিবেদনটি বলছে, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায়ও একই ধরনের আন্দোলন দানা বাঁধছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব বিক্ষোভকে সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস বলা যাবে না। তবে এগুলো ইউরোপের ভেতরে জমে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিস্ফোরণ। যে মহাদেশ রাশিয়ার সামরিক হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে, সেই মহাদেশের সাধারণ মানুষ একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও দুর্বল জনসেবার চাপে ক্ষুব্ধ। ফলে সরকারগুলোর সামনে দ্বিমুখী সংকট— একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ সামলানো।
বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনও এই অনিশ্চয়তার বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রাধান্য আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশগুলো বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী মনে করছে। এই অসন্তোষ কখনো সামরিক অভিযান, কখনো ভূখণ্ডগত দাবি, আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পরোক্ষ সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা যার উদাহরণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী নেতাদের এমন রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক সমঝোতার চেয়ে সামরিক ক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো রাষ্ট্র যদি মনে করে শক্তি থাকলেই প্রতিবেশীর ভূখণ্ড দখল করা যায়, তাহলে ছোট দেশগুলোর নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়াবে? ইউক্রেন, তাইওয়ান কিংবা ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রশ্ন।
তবে বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা আর বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। এখনো বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়নি; কিন্তু একাধিক আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সহযোগিতা, অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক জোটের ভূমিকা বাড়লে একটি সীমিত সংঘাতও বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ভুল হিসাব, দুর্ঘটনাজনিত হামলা কিংবা প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার নিয়ে সংশয় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস বলছে, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রতিপক্ষের মনোভাব নিয়ে ভুল হিসাব বড় ভূমিকা রেখেছিল। আজও প্রশ্নটি একই রকম— কোনো মিত্র আক্রান্ত হলে অন্য শক্তিধর দেশগুলো সত্যিই তার পাশে দাঁড়াবে তো? এই নিশ্চয়তা দুর্বল হলে আগ্রাসী শক্তি ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হতে পারে। আবার অতিরিক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়াও সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই। ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টালে দেখা যায়— প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগমুহূর্তে সৃষ্ট সংকটে মিত্রদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিগুলো নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল। ১৯১৪ সালে ব্রিটেন বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জার্মানির ধারণা ছিল, ১৮৩৯ সালে সই হওয়া একটা ‘কাগজের টুকরো’র জন্য ব্রিটেন যুদ্ধে জড়াবে না। জার্মানির সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। একইভাবে ১৯৩৯ সালে নাৎসিদের ঠেকাতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স পোলান্ডকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু এর আগের সংকটগুলোয় ব্রিটিশ ও ফরাসি নেতাদের অবস্থান দেখে হিটলার ধরে নিয়েছিলেন, তারা এবারও পিছিয়ে যাবে। হিটলারের সেই ধারণাও ছিল ভুল।
তাই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমাধানের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসা। ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এশিয়ার সমুদ্রসীমা, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ঘাঁটি কিংবা বিমানবন্দর থেকে ইউরোপের রাজপথ— সবখানেই ভিন্ন ভিন্ন সংকট দৃশ্যমান। এগুলো একে অন্যের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়; কিন্তু একই অস্থির আন্তর্জাতিক পরিবেশের অংশ।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য— এমন মন্তব্য এখনই করা যাচ্ছে না। কিন্তু শান্তি নিজে থেকে টিকে থাকে না। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা, কার্যকর কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শক্তিধর দেশগুলোর সংযম। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাটি সম্ভবত এখানেই, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার পরিণতি বোঝার চেয়ে, যুদ্ধের আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে আগেই তা ঠেকানো অনেক বেশি জরুরি।



