গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যম মুখোমুখি হলেই ভালো

আজকাল খুব শুনি ‘এই তোমাদের পত্রিকা-টত্রিকা থাকবে না’ ‘টেলিভিশনও দেখবে না কেউ’, ‘রেডিও তো শেষ’। সামনে একজন সাংবাদিক পাওয়া গেছে, জানতে পারলে ইদানীং এরকম কথা বলেন কিছু পরিচিত মানুষ। তারা যে লেগপুল করেন, বিষয়টি এরকম নয়। আবার ঝগড়া করতে চান, সেরকমও নয়। কথার সুরে বুঝি তিনি আমার জন্য উদ্বিগ্ন। সম্ভবত তার নিজের জন্যও। কারণ তিনিও পত্রিকা পড়তে চান, টেলিভিশন দেখতে চান, আবার রেডিও শুনতে না পেয়েও মন খারাপ করেন। আমি চুপচাপ শুনি। এর মধ্যে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলেন, এই তো সোশ্যাল মিডিয়ায় সব পাওয়া যাচ্ছে আজকাল। এই দেখ ফোনেই পত্রিকা, ফোনেই টেলিভিশন।
নিউজরুমে কাজ করতে করতে কলিগদের কারও কারও কাছেও এরকম হতাশা শুনি। তাদের কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজ করছেন। পুরোপুরি পেশা হিসেবে নিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ ভালো আয়ও করছেন। তাতে আমার সমস্যা নেই। তাদের সঙ্গে আমার চিন্তার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমার বোধে যতদূর কুলায়, তাতে বুঝি এই দ্বন্দ্ব নিয়ে কোনো বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্ক হতে পারে না। কারণ দুটি দুই জিনিস। চর্চার পদ্ধতিও ভিন্ন। কোনোভাবেই একটি আরেকটির বিকল্প নয়।
এসব প্রশ্নে পাত্তা না দিলেও বিচলিত হই কখনো কখনো। তখন নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করি, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে আসছে কেন? যতদূর মনে করতে পারি, প্রচলিত গণমাধ্যমের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সখ্য সৃষ্টির প্রবণতা প্রকাশ্য হওয়ার পর থেকে মূলত এই আলোচনা হচ্ছে। বারবার প্রশ্ন উঠছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে কি মিশে যাবে নিয়মিত গণমাধ্যম? এমন বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে আমার হাসি পায়। আর প্রশ্নকর্তাকে বলি, ‘কোনো সূত্রেই সে সুযোগ নেই’, গণমাধ্যম চাইলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় মিশতে পারবে না।
আজকাল গণমাধ্যমে যা কিছু প্রচার বা প্রকাশ হয়, এর একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত করা হয়। আর এতে প্রচলিত গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমের আর ১০ জন অ্যাকাউন্টহোল্ডারের সঙ্গে ইন্টারনেট রাজস্বে ভাগ বসাতে পারে। এরই মধ্যে কাজটি করার জন্য প্রতিটি গণমাধ্যমের বিশেষ শাখা খুলতে হয়েছে। নাম ‘সোশ্যাল’। নিউজরুমে আমরা মজা করে বলি, তারা ছাড়া সবাই আনসোশ্যাল।
একদিকে প্রতিটি মিডিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া পড়ছে ছাঁকনির মধ্যে। আর মানুষ প্রচলিত গণমাধ্যম থেকে ছেঁকে সত্য বের করতে পারছে বা তার পারার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে
যাহোক, গণমাধ্যমের সোশ্যাল-আনসোশ্যাল ভাগ নিয়েও আমার আপত্তি নেই। কারণ, প্রথমত টাকাটা লাগবে। দ্বিতীয়ত একটি নিয়মিত গণমাধ্যমের ব্যানারে সোশ্যাল মিডিয়া যখন কিছু প্রচার করে, তখন চাইলেও যাচ্ছেতাই করতে পারে না। আয় বাড়ানোর জন্য ব্যক্তি সোশ্যাল মিডিয়াকর্মী চাইলে যতটা দায়িত্বহীন হতে পারবেন, কোনো প্রচলিত গণমাধ্যমের শাখা তা পারবে না। কারণ, এতে তার মূল প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ভয় থাকবে।
আমরা দেখছিলাম সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে গণমাধ্যমে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করছে। এই চেষ্টা আমাদের সোসাইটির জন্য খুব ইতিবাচক মনে হচ্ছে। কারণ, এতে একদিকে প্রতিটি মিডিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়া পড়ছে ছাঁকনির মধ্যে। আর মানুষ প্রচলিত গণমাধ্যম থেকে ছেঁকে সত্য বের করতে পারছে বা তার পারার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখন বাকি কাজ গণমাধ্যমের।
আমার ব্যক্তিগত মত, ইন্টারনেটের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না পত্রিকা, টেলিভিশন বা রেডিও। তারা বদলে যাওয়ার পরিকল্পনা করার আগেই দ্রুততার মুখে পড়েছেন। তথ্য গণমাধ্যম দেওয়ার আগেই মানুষ জেনে যাচ্ছে। কোনো গেটকিপার ছাড়া ভুলভাল যে তথ্যই আসুক, তা মানুষের সামনেই তো আসছে। আর সেই ভুল তথ্য ধরে মানুষ এগোচ্ছে ভুল পথে। গণমাধ্যম যতক্ষণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঠিক তথ্যটি দিচ্ছে, ততক্ষণে মানুষ ভুল পথে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার আর পিছিয়ে আসার পথ থাকছে না। আর এখানে মনে হচ্ছে দুই মাধ্যম বুঝি গুলিয়ে গেল।
তথ্যবিভ্রাটের এই অরাজক পরিস্থিতি কিন্তু বিশ্ব জুড়ে। সারা বিশ্বের পত্রিকা ও টেলিভিশনের গ্রাহক কমেছে। রেডিও প্রায় নেই। কিন্তু কারণ কী? আমি এই লেখায় বাংলাদেশের কথা বলতে পারি। ধরা যাক দিনে একটি ঘটনা ঘটছে। টেলিভিশনগুলো হরদম লাইভ করল। ওয়েব পোর্টালগুলো নিউজ দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে। তাহলে কেন ঘটনার ছয় ঘণ্টা পর আবার একই জিনিস পড়বে, দেখবে বা শুনবে?
আসলে পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাকে গণমাধ্যমমুখী করতে হলে নতুন কিছু দিতে হবে। এই চেষ্টা যে এখনো কেউ কেউ করছেন না, তা নয়। কিন্তু সেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফাঁকিবাজি হচ্ছে, যেটা মানুষ সহজে ধরে ফেলছে। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ওই ঘটনার নানান প্রোপাগান্ডা হচ্ছে। তাই শুধু নিজের টিকে থাকার জন্য নয়, সমাজের দায়বদ্ধতার জন্য হলেও গণমাধ্যমগুলোকে আসলেই নতুন কিছু দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে হবে।
কেউ যদি বলেন শুধু তার কর্মীর জন্য গণমাধ্যমকে কেন বাঁচাবে সমাজের মানুষ? আমি কিন্তু তাহলে জুলিয়াস সিজারের কাছে নালিশ দেব। আড়াই হাজার বছর আগে এই ভদ্রলোক তার গ্রিক সাম্রাজ্যের প্রধান ফটকে নতুন অতিথির জন্য চামড়ায় তথ্য লিখে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। কোন পণ্যের বিনিময় মূল্য কত? সেসময় কারা এখানে তথ্য লিখত, সেটা বড় কথা ছিল না। কী লিখত, সেটাই ছিল মুখ্য। আমি মনে করি, তথ্যের প্রয়োজন নিয়ে এই দর্শনটি আজও একই রকম আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেটা ক্ষতিকর মনে হয়, মূলধারার গণমাধ্যমগুলো নিজের পদ্ধতিতে বলতে পারে সেটা কেন ক্ষতিকর। এতে সোশ্যাল মিডিয়ার কর্মীরাও কেউ কেউ নিশ্চয়ই সতর্ক হবেন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী






