যশোর জেলার গায়েহলুদ

লোকাচার আমার কাছে লোকায়ত বাংলার পল্লীজীবনের উপলব্ধির স্মারক। সমাজে লৌকিক ও অলৌকিক বিশ্বাস, সংস্কার, ধ্যানধারণাগুলোকে আশ্রয় করে নানা প্রথা-পার্বণ, আচার-উৎসব গড়ে উঠেছে। মূলত লোকাচারগুলো দেেশর মানুষের আজন্মলব্ধ প্রত্যয় ও বিশ্বাসের অঙ্গ। আর মানুষের বিশ্বাস ও কর্মের সঙ্গে দৈবশক্তির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তবে এসব লোকাচার প্রতিপালনের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর অংশগ্রহণই থাকে বেশি। আবার কোনো কোনো সময় পুরুষ ও নারী সমানভাবে অংশগ্রহণ করে। মানুষের দৈব বিশ্বাস ও বৈষয়িক মঙ্গলচিন্তা থেেকই লোকায়ত সমাজে নানাবিধ আচার ও ক্রিয়ানুষ্ঠানের সৃষ্টি হয়েছে।
শাস্ত্রীয় আচারে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় ধরনের কামনা প্রকাশিত হয়। বিবাহবিষয়ক আচারের অনুষ্ঠান গায়েহলুদ। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রেওয়াজে সম্পন্ন হয় গায়েহলুদের অনুষ্ঠান। বর-কনে উভয়পক্ষের চূড়ান্ত (পাকা খো ও পাকা কথা) হওয়ার পর পালন করা হয় গায়েহলুদ অনুষ্ঠান। আচারের ভিন্নতা থাকলেও সর্বজনীন যে আচার যশোর জেলায় খো যায়, তা হলো বর-কনের নিজ নিজ বাড়িতে পিঁড়িতে বসিয়ে আত্মীয়স্বজনরা বর ও কনেকে হলুদ মাখায়। এ সময় বরের পরনে থাকে নতুন লুঙ্গি বা ধুতি, আর কনের পরনে থাকে লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি। মধ্যবিত্ত গেরস্ত ঘরে শুধু কাঁচা হলুদ মেখে উপাচার পালন করা হলেও উচ্চবিত্তরা পরস্পরের বাড়ি থেেক ডালায় করে হলুদতত্ত্ব প্রেরণ করে থাকে। কাঁচা বাটা হলুদের পাশাপাশি তাতে থাকে শাড়ি, ছায়া, ব্লাউজ (কনের জন্য)। লুঙ্গি, ধুতি (বরের জন্য)। পান, সুপারি, ধান, দূর্বা, তিল, মেথি, চন্দন, সিঁদুর, মেহেদি, মিষ্টি ইত্যাদি। অন্যদিকে, বর বা কনেকে গায়েহলুদের জন্য আলপনা আঁকা পিঁড়িতে তুলে সখীরা সুর করে গান গাইতে থাকে। এ গানের মধ্যে সাবান, হলুদ, শাড়ি, পেটিকোট, ব্লাউজ, জুতা ইত্যাদির বিবরণ থাকে।
গোসলের পর যখন সখীরা বর-কনেকে বরণ করে, তখন তারা নতুন পোশাক পরিয়ে তত্ত্বের নান্দনিক সৌন্দর্য তুলে ধরে গানে গানে। যেমন—
এতদিন ছিলি রে হলুদ মাঠে ঘাটেতে
আজ কেন আইলিরে হলুদ বিয়ের বরণে।
এতদিন ছিলি রে জুতো বাজারের দোকানে
অাজ কেন আইলি রে জুতো বিয়ের বরণে।
কনেকে হলুদ গোসলের পর যখন পাত্রের বাড়ি থেকে আসা গয়না পরানো হয়, তখন পরিবেশন করা হয় বিশেষ ধরনের গান।
এ গানের বৈশিষ্ট্যে প্রাপ্ত গয়না ও কনের সৌন্দর্যের স্তূতি থাকে।
যেমন—
বিবির কানও দেখছি চিকুন চিকুন
বিবির কানের তা এনেছে মোটা
সেই না কানে তা পরাইতে যাইয়া
আহা ঘামাইয়া ঘামাইয়া (২)
আহা চুয়াইয়া চুয়াইয়া পড়ে।
উল্লেখ্য, যশোর জেলার এসব গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে প্রথমে মা, তারপর বাবা হলুদ মাখায় এবং মিষ্টান্ন খাওয়ানোর রীতি আজও প্রচলিত রয়েছে। তারপর পর্যায়ক্রমে অন্য স্বজনরা এ অনুষ্ঠান পালন করে। তবে মিষ্টিমুখ করানোর সময় সখীরা সংগীতের সাহায্যে কনের পক্ষ হয়ে নানা জিনিসের বায়না ধরে। সংগীতের মাধ্যমে তার প্রকাশ।
যেমন—
‘মা-ওমা খাও না কেন ক্ষীর, তোমার বিয়ের ক্ষীর?
ক্যান মা তোমার গলার হার নেব তবে খাব ক্ষীর।’
আবার ছেলে অথবা মেয়েকে গায়েহলুদ দেওয়ার জন্য আলপনা আঁকা পিঁড়িতে উঠিয়ে সখীরা গান শুরু করে এভাবে—
‘উঠোনের পরে চান্দুয়া তারির তলে মারুয়া
ঐ যে তারির তলে চায়না দাঁড়ায়ে গোসল করে না রে।’
গোসলের পর পিঁড়ির ওপর ছেলে ও মেয়ে নতুন পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন সখীরা বরণ করতে থাকে গানে।
যেমন—
‘এতদিনে ছিলি রে দুবলে আগানে বাগানে
আজ কেন আইলি রে দুবলে বিয়ের বরণে।
এতদিন ছিলি রে কুলো মুচির দোকানে
আজ কেন আইলি রে কুলো বিয়ের বরণে।’
মেয়ের গায়েহলুদ মাখানো ও গোসল হয়ে যাওয়ার পর একটি সজ্জিত আসনে বসানো হয়। তারপর মিষ্টান্ন বা ক্ষীর মুখে দেওয়া হয়। এ সময় মেয়ে গানে গানে মায়ের কাছে নানা জিনিসের আবদার করে থাকে এবং এগুলো নিয়ে নতুন শ্বশুরবাড়ি যায়।
গানটি এরূপ :
সখীরা: ‘ও বু খাও না কেন ক্ষীর তোমার বিয়ের ক্ষীর
কন্যার মার বিয়ের শিন্নি নেব তবে খাব ক্ষীর’
সখীরা: ‘ও বু খাও না কেন ক্ষীর তোমার বিয়ের ক্ষীর
কন্যার মার কানের দুল নেব তবে খাব ক্ষীর
মাগো মা খাও না কেন ক্ষীর তোমার বিয়ের ক্ষীর
কন্যার মা তোমার গলার হার নেব তবে খাব ক্ষীর।’
এভাবে যে ক্ষীর খাওয়াতে আসে তার কাছে কন্যা একটা একটা জিনিসের দাবি করে, তবে ক্ষীর খায়।
এ জেলার গ্রামাঞ্চলের মানুষের এসব লোকাচার এখনো মুখে মুখে ফেরে। যাতে সজীব হয়ে উঠেছে আমাদের লোকসাহিত্যের অবয়ব।




