ইসলামের দৃষ্টিতে সৎকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক ভূমিকা কিংবা তার জীবদ্দশার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকার মানুষের রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যখন মানুষের শেষ বিদায়ের মুহূর্তেও প্রভাব বিস্তার করে, তখন তা শুধু মানবিক মূল্যবোধ নয়; ধর্মীয় দায়িত্ববোধকেও বাধাগ্রস্ত করে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়টির তাৎপর্য গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭০) এ আয়াত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের সম্মান রয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করার সুযোগ নেই। মৃত্যুর পরও মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামি নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা আর তার মৃত্যুর পর মরদেহের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা এক বিষয় নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি মানবিক মর্যাদা প্রদর্শনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, একবার তাঁর সামনে দিয়ে একটি জানাজা অতিক্রম করলে তিনি দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হয়, এটি একজন ইহুদির জানাজা। তখন তিনি বললেন, ‘সে কি মানুষ নয়?’ (বুখারি, হাদিস: ১৩১২) এ ঘটনা মানুষের মৃত্যু ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
ইমাম ইবনে কুদামা (রহ.) তার ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থের জানাজা-সংক্রান্ত আলোচনায় মৃতের জানাজা ও দাফনের বিধান এবং মুসলিম সমাজের দায়িত্ব তুলে করেছেন। অতএব, জানাজা কোনো মৃত ব্যক্তির রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থন জানানোর অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি তার জন্য দোয়া, ক্ষমা প্রার্থনা এবং মুসলিম সমাজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের একটি মাধ্যম। কারও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার জানাজা ও দাফনের স্বাভাবিক আয়োজন বাধাগ্রস্ত হলে বিষয়টি ব্যক্তিগত বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
মৃত ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশও হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মৃতদের গালি দিও না। কেননা, তারা তাদের কৃতকর্মের পরিণতির কাছে পৌঁছে গেছে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৩৯৩) এ নির্দেশনার তাৎপর্য হলো, মৃত ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে যেন শালীনতা ও ন্যায়বোধ বিসর্জন দেওয়া না হয়। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে কোনো মৃত ব্যক্তির অন্যায়, অপরাধ বা রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা করা যাবে না; বরং সত্য প্রকাশ ও ন্যায়সংগত সমালোচনার পাশাপাশি অশোভন আচরণ, অপমান এবং প্রতিহিংসা থেকে বিরত থাকাই ইসলামি নৈতিকতার দাবি।
মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারও ভার গ্রহণ করবে না।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬৪)
রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করার প্রবণতা কোরআনের ন্যায়বিচারের নির্দেশনারও পরিপন্থী। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত:৮) এ আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিজের অপছন্দের ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার বজায় রাখতে হবে। কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় রাজনৈতিক বিরোধে জড়িত থাকলেও মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্য, স্বজন কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর সেই বিরোধের দায় চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারও ভার গ্রহণ করবে না।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬৪) অর্থাৎ একজনের দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অবশ্য জানাজা ও সৎকারের অধিকার রক্ষার অর্থ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলো উপেক্ষা করা নয়। কোনো অনুষ্ঠানে সহিংসতার বাস্তব আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ আর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে শেষকৃত্যে বাধা সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। বিধিনিষেধ আরোপ করতে হলে তা হতে হবে যুক্তিসংগত, আনুপাতিক ও বৈষম্যহীন। একইভাবে জানাজা বা সৎকারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে অপমান করা, উসকানি দেওয়া কিংবা সহিংসতা সৃষ্টি করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অধিকার রক্ষার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও জননিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
মৃত্যু মানুষের জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এ চিরন্তন সত্যের সামনে রাজনৈতিক ক্ষমতা, দলীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, বিরোধের মধ্যেও ন্যায়বিচার করতে হবে, বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না এবং মানুষের মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।



