ডেনমার্ক যেভাবে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে পথ দেখাল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডেনমার্কে তখন তৃতীয় ফ্রেডরিকের রাজত্ব। স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্র। রাজাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা বা প্রতিযোগিতার কোনো বালাই ছিল না; বরং রাজা, অভিজাত পরিবার এবং রাজদরবারের সঙ্গে সম্পর্কই ছিল চাকরির একমাত্র মানদণ্ড। রাজা তার প্রতি বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার জন্য খেয়ালখুশিমতো নিয়োগ দিতেন কর আদায়কারী, বিচারক, গভর্নর, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, বন্দর বা বাণিজ্য প্রশাসনের দায়িত্বশীল পদে। প্রশাসনিক দক্ষতাতে নয়, বরং এসব পদ দেওয়া হতো ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে।
দেশটির কিছু প্রভাবশালী পরিবার উচ্চপদে থাকত প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় একধরনের গড়ে ওঠে পরিবারতন্ত্র। এই যেমন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অবসর নিলে একই ধরনের পদ পেয়ে যেতেন তার ছেলে, জামাতা বা আত্মীয়। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল পারিবারিক পরিচয়। এমনকি ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ডেনমার্কেও কিছু পদ পাওয়া যেত অর্থের বিনিময়ে। রাজকোষে অর্থ দিয়ে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্ব পেতেন ধনী ব্যবসায়ী বা অভিজাতরা। আর এই পদ পাওয়ার পর অনেকেই সেই অর্থ উসুল তুলতেন জনগণের কাছ থেকে। আদায় করতেন অতিরিক্ত কর বা নানা অকারণ ফি।
দেশটিতে দুর্নীতির আরেকটি কারণ ছিল কর্মকর্তাদের কম বেতন। অনেক কর্মকর্তার বেতন ছিল খুব কম বা কখনো কখনো ছিলই না। তাই সুযোগ পেলেই তারা আদায় করতেন অতিরিক্ত ফি, নিতেন নানা রকম উপঢৌকন, পরিচিত ব্যক্তিদের দিতেন বিশেষ সুবিধা, ব্যক্তিগত সুবিধা নিতেন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। তখন এগুলো ছিল স্বাভাবিক বিষয়। আজকের দৃষ্টিতে এগুলো দুর্নীতি হিসেবে গণ্য হলেও সে সময় সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। কিন্তু নদীর জলও পরিবর্তন হয়। ১৮০০ শতকের শেষভাগ, বিশেষ করে ১৯০০ শতকে ডেনমার্কে একটি নতুন ধারণা শক্তিশালী হতে শুরু করে। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা জনগণের সেবক, রাজার ব্যক্তিগত কর্মচারী নন। এর ফলে গুরুত্ব বাড়ে আইনবিদ্যা ও প্রশাসনিক শিক্ষার।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। বংশ বা পরিচয়ের পরিবর্তে গুরুত্ব দেওয়া হয় যোগ্যতার ওপর। নির্দিষ্ট বেতন নির্ধারণ করা হয় কর্মকর্তাদের। ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চালু করা হয় কঠোর বিধান। এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে ডেনমার্ককে নিয়ে যায় একটি আধুনিক, পেশাদার ও তুলনামূলক দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের দিকে।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডেনমার্কের দুর্নীতি কমানোর শুরু হয়েছিল কোনো একক ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’ দিয়ে নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী স্বজনপ্রীতিনির্ভর রাজতান্ত্রিক প্রশাসন থেকে মেধাভিত্তিক ও নিয়মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তরের মাধ্যমে। আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে প্রায় ৩০০ বছরের দীর্ঘ পথ।
দুর্নীতি কমানোর কোনো শর্টকাট রুট নেই। এটি শুধু অভিযান, বক্তৃতা কিংবা কঠোর শাস্তির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্র গঠনের বিষয়
ডেনমার্কের পরিবর্তন শুরু হয়েছিল তখনই, যখন তারা উপলব্ধি করল, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি হতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তা কোনো শাসকের ব্যক্তিগত কর্মচারী নন; তিনি জনগণের সেবক। এই একটি ধারণা শুধু প্রশাসনিক সংস্কারই আনেনি, রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনই বদলে দিয়েছে। মেধাভিত্তিক নিয়োগ, পেশাদার আমলাতন্ত্র, নির্দিষ্ট বেতন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী সংসদ, কার্যকর স্থানীয় সরকার এবং অবাধ সংবাদমাধ্যম ধীরে ধীরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে দুর্নীতি শুধু আইনগত অপরাধ নয়; সামাজিক লজ্জার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমরা দুর্নীতিকে প্রায়ই ব্যক্তি কিংবা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। কোনো কর্মকর্তার গ্রেপ্তার, কোনো অভিযানের ঘোষণা কিংবা কয়েকটি আলোচিত মামলাকে উপস্থাপন করা হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ হিসেবে। কিন্তু দুর্নীতি কি কেবল কিছু অসৎ মানুষের সমস্যা? নাকি এটি এমন একটি ব্যবস্থার লক্ষণ, যেখানে নিয়মের চেয়ে সম্পর্ক, যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য এবং আইনের চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর? এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু উপসর্গের চিকিৎসা হয়ে থাকবে, রোগের নয়।
অবশ্য বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের ইতিহাস, অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। তাই ডেনমার্কের মডেল হুবহু অনুসরণ করাও সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু মৌলিক শিক্ষা নেওয়া অবশ্যই সম্ভব। যেমন— সরকারি নিয়োগে শতভাগ মেধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির অভিযোগে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শক্তিশালী করা এবং এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে সততা ব্যতিক্রম নয়; বরং স্বাভাবিক আচরণ।
দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে তখনই, যখন নাগরিক বিশ্বাস করেন তার দেওয়া কর জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে, আইনের চোখে সবাই সমান এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য কোনো তদবিরের প্রয়োজন নেই। এই আস্থা গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে; কোনো একক আইন বা অভিযানে নয়।
বাংলাদেশের জন্যও সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। দুর্নীতি কমানোর কোনো শর্টকাট রুট নেই। এটি শুধু অভিযান, বক্তৃতা কিংবা কঠোর শাস্তির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্র গঠনের বিষয়। রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন ক্ষমতার চেয়ে নিয়ম বড় হয়, আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা মূল্য পায় এবং ব্যক্তির চেয়ে বেশি সম্মানিত হয় প্রতিষ্ঠান।
ডেনমার্কের ইতিহাস আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র জন্ম নেয় না, তাকে গড়ে তুলতে হয়। আর সেই নির্মাণকাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই পথ দীর্ঘ। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এ পথের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়



