বুদ্ধ আর রুমি যখন বাজারে

শিবব্রত বর্মন। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কিছুদিন আগে একটা বই নেড়েচেড়ে দেখছিলাম, যেটার নাম ‘বায়িং বুদ্ধা, সেলিং রুমি : ওরিয়েন্টালিজম অ্যান্ড দ্য মিস্টিক্যাল মার্কেটপ্লেস’। লেখক সোফিয়া রোজ আরজানা। মিস্টিক্যাল মার্কেটপ্লেস কথাটা খুব মনে ধরল। কথাটা ঠিক। ধ্যান এখন এক পণ্যের নাম। সুফি কবিতা খুব ট্রেন্ডি। কফিশপের দেয়ালে দেয়ালে সুফি কবি রুমির উক্তি। বুদ্ধের মূর্তি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া শোপিস।
আধ্যাত্মিকতা এখন শুধু মঠ বা খানকায় সীমাবদ্ধ নেই। সাধনার ভাষা উপাসনালয়ের দেয়াল বেয়ে নেমে এসে মিশে গেছে বিপণনের ভাষায়।
গবেষক সোফিয়া রোজ আরজানার অনুসন্ধানের বিষয় বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্ম ও ইসলাম থেকে নেওয়া প্রতীক, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক চর্চার পশ্চিমা বাণিজ্যিক ব্যবহার। তার মতে, এই বাজার শুধু ধর্মীয় সংস্কৃতিকে পণ্য বানিয়েছে তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্কৃতিকে সুবিধামতো ঢেলে সাজিয়ে নিয়েছে। এক বিশাল হামানদিস্তায় বেটে ঘুটা দেওয়া পাঁচন।
এতে আমার আপত্তি কোথায়? খুশিই তো হওয়া উচিৎ।
বুদ্ধের মূর্তি বিক্রিতে আমার আপত্তি নেই। সমস্যা হলো বৌদ্ধধর্মের জটিল ইতিহাস, দর্শন, নৈতিক অনুশীলন আর তার দুঃখ থেকে মুক্তির সাধনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে বুদ্ধকে কেবল শান্ত, নিরীহ ও সুন্দর একটি ছবিতে পরিণত করা হচ্ছে। এতে শুধু ধর্মীয় প্রতীকটি অবশিষ্ট থাকছে, ভেতরটা ফাঁপা। ভেতরে অর্থের নির্যাস নেই। সোফিয়া আরজানা এই কথাটাই তুলে ধরেছেন।
হিন্দুধর্মে যোগসাধনা বলে একটা ব্যাপার আছে। সেটা আজ কেমন করে যোগব্যায়ামে পর্যবসিত হলো, সেও এক কৌতুককর ঘটনা। বাজার যোগব্যায়ামকে শরীরচর্চা আর স্ট্রেস কমানোর একটা পদ্ধতি বানিয়ে ফেলেছে। যোগকে তার ভারতীয় ঐতিহাসিক ও দার্শনিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু পশ্চিমা ভোক্তার উপযোগী পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। তৈরি হয় বিশেষ ধরনের পোশাক, প্রশিক্ষণ, রিট্রিট ও জীবনযাপনের ব্র্যান্ড। অনেক ক্ষেত্রে এইসব ব্যবসার কেন্দ্রে থাকেন এমন উদ্যোক্তা, যাদের কাছে ঐতিহ্যের সামাজিক ইতিহাসের চেয়ে বাজারমূল্যই বড়।
সোফিয়া আরজানার গবেষণার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে ত্রয়োদশ শতকের ফারসি কবি জালালুদ্দিন রুমি। এ সুফি সাধকের কবিতা আজ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। তার নামে প্রচলিত নানা উক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরে। সেগুলোর কিছু তার কবিতার ভাবানুবাদ, কিছু মুক্ত অনুবাদ। আবার কিছু ক্ষেত্রে তার নামে চালু কবিতার চরণ আদৌ তার লেখাই নয়। সারা দুনিয়ায় রুমি ছড়িয়েছেন ইংরেজি অনুবাদের মধ্য দিয়ে। এসব অনুবাদে মূল কবিতার ইসলামি ও সুফি প্রেক্ষাপট অনেক সময় আড়ালে চলে যায়।
শহুরে শিক্ষিত মহলে এই জনপ্রিয় রুমি যেন এক সর্বজনীন আধ্যাত্মিক গুরু। তার কবিতার সঙ্গে যেন ইসলাম আর সুফিবাদের কোনো যোগ নেই। রুমিকে বিশ্বজনীন করতে গিয়ে আমরা তার শিকড় মুছে ফেলেছি। তিনি যেন এক লাইফস্টাইল আইকন হয়ে উঠেছেন।
অনুবাদের মধ্য দিয়ে রুমি পৃথিবীর নানা ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, এটাকে ইতিবাচকভাবে না দেখার কিছু নেই। কিন্তু তার পরিচয়ের একটা বাজারি রূপান্তর ঘটানো হয়েছে। তার ধর্মীয় ঐতিহ্য যেন অস্বস্তিকর এবং অপ্রয়োজনীয়। রুমির অনুবাদ নিছক অনুবাদ থাকেনি। এ হয়ে উঠেছে একটা সংস্কৃতির অর্থ বদলে দেওয়ার ঘটনা।
আরজানা তার আলোচনায় এডওয়ার্ড সাঈদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ ধারণাটি টেনে এনেছেন। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তাবিদ সাঈদ দেখিয়েছেন, কীভাবে পশ্চিমা জ্ঞান ও সংস্কৃতি প্রাচ্যকে এমন এক জগৎ হিসেবে নির্মাণ করেছে, যেটা রহস্যময়, আবেগপ্রবণ, অপরিবর্তনীয় এবং পশ্চিমের তুলনায় মৌলিকভাবে আলাদা।
পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিস্টদের চোখে প্রাচ্য কখনো বিপজ্জনক, কখনো পশ্চাৎপদ, আবার কখনো আধ্যাত্মিকতার অফুরন্ত ভান্ডার। ফ্রেমটা এরকম যে পশ্চিম হচ্ছে বস্তুবাদী, ক্লান্ত ও যান্ত্রিক আর বিপরিতে প্রাচ্য শান্তি, জ্ঞান ও আত্মার মুক্তির সন্ধান দিতে পারে।
আরজানা বলছেন, এ যুগের মিস্টিক্যাল মার্কেটপ্লেস বা আধ্যাত্মিকতার বাজার এই ওরিয়েন্টালিস্ট ধারণারই নতুন প্রয়োগ। প্রাচ্যের ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে নেওয়া প্রতীক ও চর্চা পশ্চিমা ভোক্তার কাছে বিক্রি হচ্ছে মানসিক শান্তি, আত্মপরিচয় কিংবা জীবনের অর্থ খোঁজার উপায় হিসেবে।
এই মিস্টিক্যাল মার্কেটপ্লেসে ক্রেতাকে কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে হয় না। তিনি বুদ্ধের মূর্তি কিনতে পারেন, যোগসাধনা করতে পারেন, রুমির কবিতা পড়তে পারেন, বালিতে আধ্যাত্মিক পর্যটনে যেতে পারেন। নিজের পছন্দমতো বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে উপাদান বেছে নিয়ে গড়ে তুলতে পারেন ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা, যেভাবে ফুলদানিতে ফুল সাজানো হয়।
বাজার জানে ধর্মের জটিলতা বাদ দিয়ে কী করে তার আকর্ষণীয় অংশটুকু বিক্রি করা যায়।
আরজানা কথিত এই মিস্টিক্যাল মার্কেটপ্লেসে মানুষ পণ্যের পাশাপাশি কেনে পরিচয়। তারা নিজেকে অন্যের তুলনায় সচেতন, প্রশান্ত, প্রকৃতির কাছাকাছি কিংবা আত্মিকভাবে উন্নত মানুষ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়।
আরজানার চোখে এটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ।
এই বাজার বন্ধের পক্ষে আরজানা কোনো ওকালিত করতে নামেননি। তিনি বলছেন, কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কেবল তার অনুসারীদের মধ্যে আটকে রাখার যুক্তি নেই। মানুষ সংস্কৃতির আদান-প্রদান করবে, ধর্মীয় প্রতীক শিল্পে ব্যবহৃত হবে, বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে মানুষ নতুন অর্থ খুঁজে নেবে, সেটা স্বাভাবিক। তবে এই লেনদেন কতটা পারস্পরিক, কতটা সচেতন এবং কতটা ন্যায্য, সেটা আসল প্রশ্ন।
বাসায় বুদ্ধের মূর্তি বসাতে হলে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণের দরকার নেই। রুমির কবিতা পড়তেও মুসলমান হওয়া জরুরি নয়। যোগচর্চা করতে হিন্দু হতে হয় না। কিন্তু এসব ঐতিহ্যের ইতিহাস ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটকে অপ্রয়োজনীয় বলে সরিয়ে দিয়ে আমরা একটা খোলস গ্রহণ করছি। নিজেদের চাহিদার মাপে দর্জিকে দিয়ে একটা সুবিধাজনক সংস্করণ তৈরি করে নিচ্ছি। সেইটা মাথায় রাখাও জরুরি।
আধুনিক মানুষ ভোগবাদী জীবনের বাইরে জীবনের গভীর অর্থ খোঁজে। বাজার সেই আকাঙ্ক্ষাকে পণ্যে রূপান্তর করতে জানে। কিন্তু পণ্য কিনে আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি পাওয়া আর কোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হওয়া এক নয়।
কোনো ধর্মের ঐতিহ্যকে বোঝার জন্য সময় আর মনোযোগ প্রয়োজন। সেটা কোনো সুন্দর প্যাকেটে ভরে ঘরে নিয়ে যাওয়া যায় না।



