তুমি আর কত জবানবন্দি চাও

‘আমি বিচার চাই না। কারণ, আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। এটি বড়জোর পনেরো দিন চলবে, তারপর অন্য কোনো ঘটনা ঘটবে এবং এটি ধামাচাপা পড়ে যাবে।’
একান্তই এক নিরস্ত্র, সাধারণ মানুষের— আরও বিশেষভাবে বললে, নৃশংসতার শিকার এক শিশুকন্যার পিতার এই মন্তব্য কোনো সাময়িক হাহাকার নয়, কোনো ব্যক্তিগত সমর্পণও নয়। বরং তা রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনের ব্যর্থতার মুখের ওপর, আমাদের সম্মিলিত হেরে যাওয়ার কালের এক তীব্র শ্লেষ, এক চূড়ান্ত প্রতিবাদ এবং এক শেষতম প্রত্যাঘাত। যে পিতৃত্বের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তার এই ‘বিচার না চাওয়া’ আসলে আমাদের চেনা বিচার ব্যবস্থার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। যখন আদালতের দরজায় কড়া নাড়ার চেয়ে নিভৃতবাস বা নীরবতা বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হয়, তখন বুঝে নিতে হবে— আমরা এক অতলান্তিক নৈতিক দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। এটি এক সাধারণ পিতার সর্বোচ্চ এবং সর্বশেষ প্রতিবাদের ভাষা। যে মিডিয়া কদিন এই রক্ত নিয়ে হইচই করে আবার নতুন কোনো মুখরোচক ‘ইস্যু’র খোঁজে চলে যায়, সেই গণমাধ্যমের চামড়ার ওপরেও এটি এক জ্বলন্ত সত্যের চাবুক।
আমরা এখন বাস করছি এক অদ্ভুত, কাফকায়েস্ক (Kafkaesque) গোলকধাঁধায়। ফ্রান্ৎজ কাফকার উপন্যাসের মতোই এ এক এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে অপরাধের চেয়ে অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াটি নাগরিকের জন্য বেশি যন্ত্রণাদায়ক, গোলমেলে এবং ভয়ংকর। আদালতে সুবিচারের আশা এখানে এক অন্তহীন ক্লান্তিযাত্রা মাত্র। বারবার হাজিরা, প্রতিপক্ষের কুৎসিত ও সন্দেহজনক প্রশ্নবাণ, চারপাশের অদৃশ্য সামাজিক চাপ আর অর্থের ভেলকিতে এখানে নিহতের পরিবারকেই উল্টো আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের শুচিতার প্রমাণ দিতে হয়। এই জটিল ও নির্মম ব্যবস্থার গোলকধাঁধায় পড়ে মানুষ ধীরে ধীরে প্রতিরোধের ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলে। নাগরিক তখন চুপ থাকে স্রেফ ভালো থাকার লোভে, নিজের অস্তিত্বটুকুকে অক্ষত রাখার স্বার্থে।
ঢাকার পল্লবীর আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার। স্কুলের ফার্স্ট গার্ল। যে ছোট্ট জুতা জোড়া খুলে সে ঘরে ঢুকেছিল, তা আজ দরজার বাইরে একা পড়ে থেকে এই রাষ্ট্রকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে নিষ্পাপ শরীরটাকে কেটে টুকরো টুকরো হতে হলো তাকে। অথচ ঠিক একই দিনে তীব্র এক অন্ধকারের ভেতর তলিয়ে গেল ১০ বছরের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মো. আবদুল্লাহ। তার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেল বাথরুমে। ঘটনাটি নিয়ে ফেসবুকে একজন নেটিজেন লিখেছেন—
‘যদি সামান্য সময়ের জন্যও আবদুল্লাহর লাশের জবান খুলে যেত, সেও হয়তো রামিসার মতোই বলত— আমার জীবনটাও তো এক ছিল, তবে আমাকে নিয়ে কেন কেউ কথা বলল না?’
কেন কিছু মৃত্যু আলো পায় আর কিছু মৃত্যু স্রেফ সংখ্যার খতিয়ানে হারিয়ে যায়? এখানে শোকেরও একটা শ্রেণিবিভাগ আছে, কান্নারও একটা বাজারদর আছে!
যে পিতৃত্বের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তার এই ‘বিচার না চাওয়া’ আসলে আমাদের চেনা বিচারব্যবস্থার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
আসলে এ দেশে এখন শিশুদের এক অবধারিত মৃত্যুকূপ। হোক সে ছেলে কিংবা মেয়েশিশু। পরিসংখ্যানের পাতা ওল্টালে গা শিউরে ওঠে। মাত্র সাত দিনে চার-চারটি শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো! পল্লবী থেকে সিলেট— সবখানেই এক বিভীষিকা। সিলেটে চার বছরের ফাহিমাকে যৌন নির্যাতনের পর ব্যাগে ভরে ডোবায় ফেলে দিল আপন চাচা। ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর লাশ লুকিয়ে রাখা হলো ভুট্টাক্ষেতে; খুনি এক নবম শ্রেণির ছাত্র! মুন্সীগঞ্জে সৎমামার লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারাল ১০ বছরের আরেক শিশু। যখন চারপাশের বাতাস এমন পৈশাচিকতায় ভারী হয়ে ওঠে, তখন কোনো মা রাতের আঁধারে সন্তানের অব্যবহৃত ফিডার বা পোশাকে মৃত শিশুর ঠোঁটের স্পর্শ আর গন্ধ খোঁজেন, আর একজন বাবা সমাজের সামনে শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে একা হলেই ভেঙে চুরমার হয়ে যান।
কখনো হাসপাতালের অবহেলায় আয়ান বা আহনাফ, কখনো সড়কে, কখনো নর্দমায় কিংবা কখনো মাগুরার আছিয়ার মতো পৈশাচিকতায় শিশুরা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আছিয়া হত্যার বিচার মাত্র ১৪ কার্যদিবসে হলেও এক বছর ধরে তা হাইকোর্টে ঝুলে রয়েছে। ২০১৬ সালের সেই শিশু পূজার কথা কি আমরা ভুলে গেছি? যার যৌনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে নিয়েছিল পিশাচ সাইফুল। আদালত তাকে যাবজ্জীবন দিলেও গত বছর সে দিব্যি জামিন পেয়ে বেরিয়ে গেল! এই কি তবে ন্যায়বিচারের নমুনা? এই ভয়ার্ত ও অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে, শৈশব কাটাচ্ছে আমাদের শিশুরা। আর সন্তান হারানোর ট্রমায় সমাজের মা-বাবাদের নিরুপায় বেঁচে থাকা। তথাকথিত স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা আর আপসের সংস্কৃতিই আমাদের গিলতে শেখায়— চুপ থাকাই নিরাপদ থাকার সেরা কৌশল। নিরাপদে বাড়ি ফেরার চ্যালেঞ্জ নিয়ে শিশুরা স্কুলে যায়।
কিন্তু এই নির্মমতা শুধু এই ভূখণ্ডের নয়, বিশ্ব জুড়েই আজ মানব সভ্যতা উপুড় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইউক্রেনের রঙিন আঁকা বাড়ির ওপর পড়ছে মিসাইল, সিরিয়ার আলেপ্পোর ধূলি-ধূসরিত ওমরান দাকনিশ অ্যাম্বুলেন্সে বসে থাকে নির্বাক চোখে— যার কান্নার ভাষাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। গাজার ধ্বংসস্তূপে মৃত মায়ের স্তন চুষে দুধ খোঁজে ধুলোমাখা শিশু। আর ভূমধ্যসাগরের তীরে যখন সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট কুর্দি শিশু আয়লান কুর্দির নিথর দেহ ভেসে আসে— যেন ভূমধ্যসাগরের বালুকাবেলায় দাঁড়িয়ে থাকা সভ্যতার পায়ের কাছে এক চরম ধিক্কার আর প্রশ্নবোধক হয়ে ফিরে এসেছে শিশুটির নিথর দেহ। এ কী তোমাদের সভ্যতার যাবতীয় আয়োজন?
আয়লানের সেই লাল টি-শার্ট আর নীল প্যান্ট পরা নিথর শরীরটা ইউরোপের তথা গোটা বিশ্বের বিবেকের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল। সারা পৃথিবীর অসহায় মা-বাবারা আজ সন্তানের জন্য একটু নিরাপদ আবাসের খোঁজে যেন উত্তাল সাগরে ট্রলারে ভাসছে। রামিসা, আবদুল্লাহ কিংবা আয়লানরা প্রমাণ করে দিয়ে গেছে— এই সভ্যতায় শুধু শিশুরাই অনিরাপদ নয়, অনিরাপদ খোদ ন্যায়বিচারও। এই সমষ্টিগত পাপের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের আর কোনো অজুহাত চলে না। যে পিতামাতা সন্তানের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তারা মর্মে মর্মে হেরে যাচ্ছে। যে সমাজ তার শিশুদের মেরে ফেলছে পৈশাচিকভাবে, সে সমাজ পচে গেছে। যে রাষ্ট্রের কাছে পিতারা সন্তান হত্যার বিচার চায় না, সেই রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। শিশুদের এই ক্ষতবিক্ষত লাশের পাশে দাঁড়িয়ে এখন তুমিই বলো রাষ্ট্র— তুমি আর কত জবানবন্দি চাও?
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়




