জিয়া ও মঞ্জুর হত্যা আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘ ৪৫ বছর পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সাবেক মেজর মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সংঘটিত সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের অনেক কিছু আজও দেশবাসীর কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি এবার উন্মোচিত হবে জিয়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ইতিহাস?
আমি যখন আমার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিবাহিনী, জিয়া হত্যা, মনজুর খুন’ গ্রন্থের জন্য গবেষণা করেছিলাম— আমার অনুসন্ধান ছিল সাক্ষাৎকারভিত্তিক। কিন্তু তখনই জিয়া হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর প্রেক্ষাপট এবং এর পরবর্তী সামরিক অস্থিরতার অনেক দিক সামনে এসেছিল। দীর্ঘ চার দশক পর মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই মামলার মোড় কতটুকু ঘুরবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল।
সে সময় যে সামরিক আদালতে মামলা করা হয়েছিল এবং যাদের দণ্ড কার্যকর হয়েছিল, তাদের কাছ থেকে আসলে কী তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তা আমরা সাধারণ মানুষ বা গবেষকরা বিস্তারিত জানতে পারিনি। তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে একটি আদালত গঠন করেছিলেন এবং দ্রুত বিচার শেষ করেছিলেন। সেই বিচারে আসামিপক্ষের ডিফেন্ডেন্ট হিসেবে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যারা ছিলেন যেমন মেজর জেনারেল আইনুদ্দিন কিংবা মেজর জেনারেল সৈয়দ ইব্রাহিম— তাদের কোনো কথাই সে সময় আমলে নেওয়া হয়নি। জেনারেল ইব্রাহিম আমাকে নিজে বলেছেন, তারা অনেক চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু আদালত আগে থেকেই রায় ঠিক করে রেখেছিল। ফলে সেই বিচারপ্রক্রিয়াটি মূলত ছিল ‘সেনা বিদ্রোহের বিচার’, সুনির্দিষ্টভাবে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়।
তৎকালীন একটা প্রবল গুঞ্জন ছিল, এরশাদ মূলত ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে’ চেয়েছিলেন। এরশাদ নিজে পরে এই মামলার আসামি হলেও রাজনৈতিক দলগুলো তাকে নিয়ে শুধু ক্ষমতার খেলাই খেলেছে, মামলার চূড়ান্ত মীমাংসা কেউ করেনি। এখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম পলাতক আসামি মোজাফফর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো অনেক কিছুই জানা সম্ভব। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি না? আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু সুখকর নয়।
১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত মাজেদকে যখন গ্রেপ্তার করা হলো, তখন তাকে দিয়ে মিডিয়ায় একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা প্রচার চালানো হয়েছিল যে, সবকিছুর জন্য জিয়াউর রহমান দায়ী। সেখানেও একধরনের রাজনৈতিক মতলব ছিল। ফলে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এই তদন্ত কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেনারেল মঞ্জুরকে কেন তড়িঘড়ি করে খুন করা হলো, এর পেছনে এরশাদ বা অন্যদের ইনভলভমেন্ট কতটুকু ছিল— সেটা জানা সবচেয়ে জরুরি। মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত জিয়া হত্যাকাণ্ডের পুরো প্রেক্ষাপট এবং নেপথ্যের গভীর ষড়যন্ত্র কখনোই বোঝা সম্ভব নয়
মেজর মোজাফফরের ছদ্মনামে ভারতে পালিয়ে থাকা এবং পরে ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশে এসে আত্মগোপন করে থাকার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে। পলাতক আসামিরা সাধারণত দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোজাফফরের অবস্থান করাটা খুব অস্বাভাবিক নয়, কারণ আওয়ামী লীগের মূল মাথাব্যথা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে; জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাদের কোনো রাজনৈতিক মাথাব্যথা বা আগ্রহ ছিল না। যার কারণে মাজেদের যে পরিণতি হয়েছিল, মোজাফফরের তা হয়নি। মোজাফফর হয়তো ভাবতেও পারেননি, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ মামলাটি নিয়ে নতুন করে নাড়াচাড়া হবে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বিচারের ফোরাম নিয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের সামরিক আইনের আওতাতেই বিষয়টি সেনাবাহিনী খতিয়ে দেখছে। যেহেতু ঘটনাটি সামরিক বাহিনীর ভেতরের এবং আইনগত কিছু বাধ্যবাধকতা আছে, তাই তাকে সামরিক বাহিনীর কাছে সোপর্দ করার একটা আইনিপ্রক্রিয়া রয়েছে। তবে বিচারপ্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত সিভিল কোর্টে বা বেসামরিক আদালতে হওয়া সম্ভব। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার সিভিল আদালতে হয়েছিল, কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তখন আর সামরিক বাহিনীতে ছিলেন না। মোজাফফর হোসেনও এখন আর সামরিক বাহিনীর কেউ নন। সুতরাং এ মামলার বিচার বেসামরিক আদালতে হতেই পারে। তবে সামরিক বাহিনী যদি এটি সিভিল আদালতে দিতে না চায়, তবে বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবে কি না বা কীভাবে সমন্বয় করবে, তা সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের চেয়ে এ বিষয়ে আমি আইনমন্ত্রী বা অ্যাটর্নি জেনারেলের সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা জানতে বেশি আগ্রহী।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটনে সবচেয়ে বড় ‘মিসিং লিংক’ বা অন্ধকার দিক হলো, মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড। এই দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। জিয়া হত্যাকাণ্ডে মঞ্জুরের সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা নিয়ে একটি চিরন্তন ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমার গবেষণায় এবং মঞ্জুরের সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকা মেজর রেজাউল করিমের (যার ১৪ বছরের জেল হয়েছিল) সাক্ষাৎকার থেকে আমি যা জেনেছি— মেজর মঞ্জুর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তিনি একপর্যায়ে দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেন। পরে যখন দেখলেন পেছনে কোনো সমর্থন নেই, তখন তিনি সেনানিবাস ছেড়ে চলে যান এবং গ্রেপ্তার হন। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর তাকে পুলিশের কাছ থেকে তড়িঘড়ি করে সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং খুন করা হয়।
জেনারেল মঞ্জুরকে কেন তড়িঘড়ি করে খুন করা হলো, এর পেছনে এরশাদ বা অন্যদের ইনভলভমেন্ট কতটুকু ছিল—সেটা জানা সবচেয়ে জরুরি। মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত জিয়া হত্যাকাণ্ডের পুরো প্রেক্ষাপট এবং নেপথ্যের গভীর ষড়যন্ত্র কখনোই বোঝা সম্ভব নয়।
সামরিক আদালতের গোপনীয় বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অনেক তথ্যই জনগণের আড়ালে থেকে যায়। উন্নত বিশ্বে একটি নির্দিষ্ট সময় পর রাষ্ট্র তাদের অত্যন্ত গোপনীয় নথিও অবমুক্ত (Declassify) করে দেয়। আমাদের দেশে সে সংস্কৃতি নেই; এখানে জনগণের কাছ থেকে তথ্য সবসময় গোপন করা হয়। তাই অসামরিক বা সামরিক— আদালত যেখানেই হোক না কেন, তথ্য অবমুক্ত করার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার সবচেয়ে জরুরি। জিয়াউর রহমান একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তার মৃত্যুর প্রকৃত সত্য জানার অধিকার দেশের সাধারণ নাগরিকদের আছে। কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা অনুমাননির্ভর রাজনীতি না করে, সরকারের উচিত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক দায়টির সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মীমাংসা করা।
লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক





