বেসরকারি চাকরিজীবীদের কী হবে?

কবি ও লেখক নাঈমুল মাসুম
নবম পে স্কেল ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর জীবনে স্বস্তি আনতে পারে। মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত আয় কমে গেলে বেতন পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের আয়নায় তাকালে আরেকটি ছবি ভেসে ওঠে। একই বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সরকারি কর্মচারী ও একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর আয়-নিরাপত্তা কি সত্যিই সমান? উত্তরটি না। এখানেই নবম পে স্কেলের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন।
সরকারি চাকরির বেতন একটি নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে চলে। গ্রেড আছে, নিয়মিত বেতন আছে, ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা আছে, চাকরির তুলনামূলক স্থায়িত্ব আছে এবং অবসরের পরও নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার সুযোগ থাকে। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীর আয় শুধু আজকের বেতন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ভবিষ্যৎ আয়ের একটি পূর্বানুমানযোগ্য কাঠামো। তা ছাড়া চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা কিংবা গৃহনির্মাণ ঋণের মতো বিশেষ সুবিধাগুলো সরকারি কর্মচারীর সামাজিক নিরাপত্তাকে বাড়তি সুরক্ষা দেয়।
বেসরকারি চাকরির বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, একই কর্মঘণ্টা কিংবা কখনো বেশি দায়িত্ব পালন করেও একজন বেসরকারি কর্মী সবসময় একই ধরনের আয়-নিরাপত্তা পান না। প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে চাকরি চলে যেতে পারে, ইনক্রিমেন্ট স্থগিত হতে পারে, পদোন্নতি অনিশ্চিত হতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠানে অবসরকালীন নিরাপত্তাও সরকারি চাকরির মতো শক্তিশালী নয়। ফলে মাস শেষে পাওয়া বেতনই যেখানে জীবনের প্রধান ভরসা, সেখানে চাকরি হারানোর আশঙ্কা মানে পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও যেখানে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা তাদের জীবনযাত্রার মানকে তলানিতে নামিয়ে আনে।
নবম পে স্কেল সফল হবে তখনই, যখন সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের আয়বৈষম্য কমানোরও নতুন যাত্রা শুরু হবে
আরও বড় বৈষম্য দেখা যায় আয়ের সঙ্গে সুবিধার তুলনায়। সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে শুধু মাসিক আয় বাড়ে না; তার সঙ্গে নির্দিষ্ট কাঠামোর অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মূল্যও বাড়তে পারে। বিপরীতে বেসরকারি কর্মীর বেতন একই গতিতে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত বোঝা তার ওপর সরাসরি পড়ে। অর্থাৎ কাগজে দুজনই চাকরিজীবী, কিন্তু অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মানচিত্রে তারা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। শ্রমিকের রক্ত-ঘামে দেশের জিডিপি সমৃদ্ধ হলেও তার সুফল বণ্টন হয় চরম বৈষম্যের মধ্য দিয়ে।
এই ব্যবধানের মধ্যেই নবম পে স্কেলকে দেখতে হবে। ১৪ লাখ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো একদিকে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করবে; অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ সমানতালে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। তখন বেতন না বাড়া বেসরকারি কর্মী, শ্রমিক ও অনিশ্চিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ার পর বাজারদর যদি তার চেয়েও দ্রুত বাড়ে, তবে সেই স্বস্তির একটি অংশ আবার বাজারই কেড়ে নেবে। শুধু বেতন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা আখেরে অর্থনীতির জন্য আরও ভয়াবহ দেউলিয়াত্ব ডেকে আনতে পারে।
তাই নবম পে স্কেলের সঙ্গে জাতীয় মজুরি ও আয়নীতির আলোচনা জরুরি। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য বেতন, শ্রমিকের জীবনধারণযোগ্য মজুরি এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মজীবীদের সামাজিক সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। সরকারি সেবার মান ও জবাবদিহিও বাড়াতে হবে, যাতে করদাতার অর্থে দেওয়া অতিরিক্ত বেতন উন্নত সেবার মাধ্যমে জনগণের কাছে ফিরে আসে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতি কমিয়ে সরকারি সংস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে করদাতার অর্থের সঠিক প্রয়োগ সম্ভব হবে না।
১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর স্বস্তি রাষ্ট্রের দায়িত্ব; কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের অনিশ্চয়তা রাষ্ট্রের নিয়তি হতে পারে না। নবম পে স্কেল সফল হবে তখনই, যখন সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের আয়বৈষম্য কমানোরও নতুন যাত্রা শুরু হবে। একই দেশে দুই অর্থনীতি নয়— রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত এমন অর্থনীতি গড়তে হবে, যেখানে শ্রমের মর্যাদা অনুযায়ী নিরাপত্তা সবার অধিকার।
লেখক: কবি ও লেখক
ফেনী



