শিক্ষার্থীর পথের বাঁধা ‘মেতে থাকা’ আর ‘তেতে থাকা’

সংগৃহীত ছবি
একজন শিক্ষার্থীর জন্য জীবনের লক্ষ্য পরিষ্কার থাকা ভীষণ জরুরি। আসলে, তুমি কোথায় আছো, কোথায় যেতে চাও, আর কীভাবে যাবে এসব জানলে সামনে এগিয়ে চলার পথ অনেক সহজ হয়। আমরা সময়ের প্রায় পুরোটাই লক্ষ্য ছাড়াই কাজ করি, কথা বলি, ঘুরে বেড়াই, কি করছি, কেন করছি তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। অথবা বলা যেতে পারে যে, আমার কাছে যেটা করতে ভাল লাগছে তাই করছি, যেটাকে বলা যায় যে নিজের খেয়াল-খুশি মত সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি, কিন্তু সেটা শেষমেশ কোনো ফল দেয় না। এভাবে সময় যেমন নষ্ট হয়, জীবন কি, জীবনের উদ্দেশ্য কি, কেন বাঁচবো এই বিষয়টাও ঠিকঠাক ভাবে বুঝা হয় না। জীবনে বাঁধা আসবে, চ্যালেঞ্জ কিংবা ব্যর্থতা আসবেই, সেটা মেনে নিতে হবে। হতাশ হয়ে যদি থেমে থাকো, তবে কোনো কিছুর অগ্রগতি হবে না। বরং কোনটা জরুরি, সেটার গুরুত্ব বুঝে কাজ করে যেতে হয়। যদি শুধু সাময়িক আনন্দ কিংবা বিনোদনকেই বড় মনে করো, ভবিষ্যৎ ভালো হবে না এটা খুব সহজেই বোঝা যায়। জীবন গুছিয়ে চলতে হয়, আনন্দ চলবে ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য আর দায়িত্ব ভুলে গেলে চলবে না।
ধরা যাক, বাসায় তোমাকে একদিন রন্না করতে দেয়া হলো । তুমি খিচুরি রান্না শুরু করলে, চাল, ডাল, মশলা দিয়ে রান্না করছো, যখন লবণ দিবে তখন বললে যে এক কেজি লবণ পুরোটা এক কেজি চালে দিয়ে দিবে। সবাই বলল যে এটা দিলে তো খাওয়া যাবে না, কিন্তু তুমি বলছ যে না এটা দিতে আমার ইচ্ছে করছে আমি দিব । কিন্তু বিষয় হচ্ছে তোমার এটা ভালো লাগছে তাই করতে চাচ্ছো কিন্তু এটার পরিণতি ভাবতে চাচ্ছো না । রান্না করার উপকরণের একটি সঠিক অনুপাত আছে । ঠিক জীবনের উপকরণগুলোর জন্য যদি আমরা একটা গ্রহণযোগ্য অনুপাত অনুসরণ করতে পারি তাহলে জীবন হবে সুন্দর । জীবনে গল্প, আড্ডার প্রয়োজন আছে, কিন্তু কতটুকু ? ঠিক লবণের মত । আমরা যদি গ্রুপ ডিসকাশন, লাইব্রেরী ওয়ার্ক, হোম ওয়ার্ক, নিজের যত্নায়ন, কর্ম পরিকল্পনা সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ বাদ দিয়ে শুধু আড্ডা, ফুর্তি, ঘুরাঘুরি, হইচই নিয়ে ব্যাস্ত থাকি তাহলে অদুর ভবিষ্যৎ কেমন হবে তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি । জীবনের উপকরণগুলো সঠিক অনুপাতে গুছানোর দক্ষতাই একজনকে অনন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে, তখন সে তার কাজগুলোকে গুছাতে পারবে । নিজের কাজগুলো গুছানো মানে জীবনকে গুছানো।
প্রজাপতি যেমন সুন্দর হলেও তার সৌন্দর্য বেশি দিন টিকে না। শিক্ষার্থীর জীবনও তাই, যদি শুধু বাহ্যিক ফিটফাট, চমক আর বাহবায় পেছনে ছুটে চলে, তবে আসল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যেতে হয়। আর বিপদের মুখে বা ব্যর্থতার সময় হাল ছেড়ে দিলে, নিজের ভেতরের শক্তিটাই হারিয়ে যায়। জীবনে বাধা আসা স্বাভাবিক, তাতে দমে গেলে তো চলবে না। ওটা অতিক্রম করতেই হবে, এর জন্য অর্জন করতে হয় দূরদৃষ্টি, ধৈর্য আর নিজের ওপর বিশ্বাস। সাফল্য কখনোই এমন নয় যে রাতে ঘুমিয়ে থাকলাম সকালবেলা এসে সে হাজির । নিয়মিত চেষ্টা, অধ্যবসায়, ভুল থেকে শিখে সামনে এগোতে হয়, যদি প্রতিনিয়ত আপ্রাণ প্রয়াস অব্যাহত থাকে তবেই সফলতা ধরা দেয়।
সবকিছু ইচ্ছে মতো হয় না। ব্যর্থতা আসবেই, হতাশাও আসবে। কখনো মনে হবে, অন্যেরা সব পারছে, তুমিই পারছো না। তবু দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নিজেদের ভুল ধরতে হবে, নতুন করে শুরু করতে হবে। সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে শুধু মেধা নয় অভ্যাস, ইচ্ছা, পরিশ্রম, আর সময়ের যথার্থ ব্যবহারের ওপর।
আজকের শিক্ষার্থীরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না কারণ অনেক। অতিরিক্ত ব্যস্ততা, অপ্রয়োজনীয় কিছু নিয়ে পড়ে থাকা, এসব খুবই সাধারণ সমস্যা। প্রযুক্তি আর সোশ্যাল মিডিয়া জীবনের অনেক কিছু সহজ করেছে, সেটা মানতেই হবে। কিন্তু যখন এটার ব্যাবহার দরকারের সীমার বাইরে চলে যায়, তখন পড়াশোনা আর সৃজনশীল কাজে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও মনে হয়, কোনো একটা বিষয় নিয়ে এতই ব্যস্ত যে পড়ার জন্য সময়ই বের হয় না। আবার ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অকারণ রাগ, ক্ষোভ, প্রতিযোগিতা এসব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের শুধু মানসিক চাপ বাড়ায়।
‘মেতে থাকা’ আর ‘তেতে থাকা’, দুইটাই শিক্ষার্থীর পথে বাঁধা, একদিকে মজা, সোশ্যাল মিডিয়া আরেকদিকে এটা সেটা নিয়ে রাগ আর ক্ষোভ; দুই মিলে মনটা খারাপ হয়ে থাকা। কোন কিছুতেই ঠিক মন বসে না। পড়াশোনার পাশাপাশি আনন্দ-বিনোদন লাগেই, কিন্তু কোথায় সীমা টানতে হবে সেটা বোঝা দরকার। সময়টা কাজে লাগানো খুব দরকারি।
শিক্ষার্থীর সামনে সবসময় দুটো রাস্তা খোলা থাকে। চাইলে এখনকার আনন্দ-ফুর্তি, উত্তেজনায় মেতে থাকতে পারে। আবার চাইলে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করতেও পারে। আকাশের নক্ষত্রটা যেমন টিকে থাকে, তেমনি ধৈর্য, শ্রম আর শৃঙ্খলার সাফল্যও স্থায়ী হয়। অন্যদিকে, উল্কার মতো বাড়াবাড়ি উজ্জ্বলতা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তাই কয়েক মুহূর্তের আনন্দের জন্য ভবিষ্যত্ নষ্ট করাটা ঠিক নয়। বরং বড় স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে হয় ধীরে ধীরে।
আজকের শিক্ষার্থীরা ‘মাস্তি’, ‘দোস্তি’, ‘চিল’ এসব পছন্দ করে, এতে কিছু অস্বাভাবিক নেই। বন্ধু, আনন্দ, বিনোদন সবই লাইফের অংশ। কিন্তু এইসবই যদি সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমস্যার শুরু। রোজকার সময়টা যদি আড্ডা আর মজায় চলে যায়, পড়াশোনা কিংবা দক্ষতা শেখার সময়ই থাকে না। নদীর মতো ভেসে চলা সহজ, কিন্তু লক্ষ্য ঠিক করলে মাঝেমধ্যে সেই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে হয়।
পাহাড়ে ওঠার মতোই, জীবনের বড় সাফল্যও আসে ছোট ছোট চেষ্টা, সময়ের কদর, আত্মনিয়ন্ত্রণ আর কিছু অর্জন করতে হলে যে কিছু ছেড়ে দিতে হয় তা অনুধাবনের মধ্যে দিয়ে। কখনো কখনো সামান্য আনন্দের জন্য সব ছেড়ে দিলে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু পরে সেটার মাশুল দিতে হয়। তাই আনন্দ আর দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার।
সবকিছু ইচ্ছে মতো হয় না। ব্যর্থতা আসবেই, হতাশাও আসবে। কখনো মনে হবে, অন্যেরা সব পারছে, তুমিই পারছো না। তবু দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নিজেদের ভুল ধরতে হবে, নতুন করে শুরু করতে হবে। সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে শুধু মেধা নয় অভ্যাস, ইচ্ছা, পরিশ্রম, আর সময়ের যথার্থ ব্যবহারের ওপর।
শেষ কথা, সাফল্য কোনো ম্যাজিক নয়, হঠাৎ উড়ে আসে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, নিয়মিত পড়াশোনা, নিয়ন্ত্রণ, আর ধারাবাহিক চেষ্টার ফলেই ভবিষ্যৎ তৈরি হয়। সাময়িক আনন্দ বা হতাশা নিয়ে হারিয়ে গেলে চলে না। মানে, বাস্তব লক্ষ্য ঠিক করে, আত্মবিশ্বাস আর ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে গেলে, সুন্দর আর সফল জীবন গড়া সম্ভব।
লেখক: অধ্যাপক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ,
জাগান্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ।




