ভারত, তেলাপোকা ও অভ্যুত্থান

লেখক ও চিত্রনাট্যকার শিবব্রত বর্মন
ভারতে কিছুদিন ধরে যা ঘটছে, তাতে একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরেই সামনে আসে— নয়াদিল্লিতে তরুণদের বিক্ষোভ কি সেদেশে একই রকম আরেক জেন-জি অভ্যুত্থানের সূচনা? শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ আর নেপালের পথ ধরে ভারতও কি একটা ওলটপালট গণঅভ্যুত্থানের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে?
বিশেষ করে গত সোমবার নয়াদিল্লির রাস্তায় তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ার ধরন দেখে এই প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে এক তরুণ-নেতৃত্বাধীন অনলাইন গ্রুপের ডাকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তরুণ এদিন সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। পুলিশ ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করেছে। আমরা টিভিতে দেখেছি পুলিশ কী নির্মমভাবে আন্দোলনকারীদের পিটিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সংঘর্ষে ১৮০ জন আহত হয়েছেন। আটক করা হয়েছে বহু আন্দোলনকারীকে।
সমস্যার মূলে গত মে মাসের প্রশ্নপত্র ফাঁস। লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর জীবন বিপর্যস্ত করে দেওয়া এ ঘটনায় তরুণরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, তারা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং বেকার তরুণদের প্রতি সরকারের জবাবদিহির মতো বড় বড় দাবি জানাতে থাকেন। তবে দিল্লির রাজপথে সোমবার যা ঘটল, তাতে স্পষ্ট— এটা আর শুধুই একটা পরীক্ষা বা একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়। এটা ক্রমেই ভারতের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জমতে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হচ্ছে। আপাতত পার্লামেন্ট অভিমুখী পদযাত্রা স্থগিত করে যন্তর-মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি, অনশন এবং দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছেন তরুণরা। সরকারের টনক নড়েছে। তারা আলোচনার দরজা খুলেছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি নয়, তারা চান দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা আর নেপালে যা হয়েছে, তা ভারতে নয় কেন?
ভারতে এ আন্দোলনের কেন্দ্রে যে অনলাইন সংগঠন, সেই ককরোচ জনতা পার্টির আকস্মিক উত্থান সবাইকে বিস্মিত করেছে। প্রথমে এটা ছিল একটা ডিজিটাল কমিউনিটি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে অনলাইন ক্ষোভ বাস্তবের প্রতিবাদে রূপ নিয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টি এখন যা করছে, তাকে অনেক পর্যবেক্ষক ভারতের প্রথম প্রকৃত ‘জেন-জি আন্দোলন’ বলতে কসুর করছেন না। একে তো এর সামনের সারিতে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীরা। তার ওপর তাদের রাজনৈতিক ভাষা এবং সংগঠনের ধরন একেবারে নতুন। এর জন্ম হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিজস্ব পরিসরে। মিম, ব্যঙ্গবিদ্রুপ, হ্যাশট্যাগ আর রিলস ছিল তাদের প্রথম অস্ত্র। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো কোনো দীর্ঘ সাংগঠনিক কাঠামো, আদর্শগত ইশতেহার বা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাদের নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস, চাকরির অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এই তরুণদের একত্র করেছে। তারা দলীয় পতাকা এড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে সামনে এনেছে।
এদিক থেকে ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশের সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর মিল পাওয়া যায়। এ তিন দেশে দেখা গেছে, আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল এমন এক প্রজন্ম, যারা আদর্শগত বিভাজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে দক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে। মোটকথা, পরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল কম। তাদের মূল মন্ত্র ভবিষ্যতের রাজনীতি বা পলিটিকস অব ফিউচার।
ভারতে ককরোচ জনতা পার্টিও একই প্রশ্ন তুলছে: যোগ্যতা থাকলেও কেন চাকরি নেই? পরীক্ষা কেন বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসে কলুষিত হয়? রাষ্ট্র তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে? এসব কারণে অনেকে এটিকে জেন-জির রাজনৈতিক চেতনার একটি নতুন প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
প্রশ্ন হলো, এটি যদি একটি জেন-জি আন্দোলনের সূচনাবিন্দু হয়ও, এটা কি ভারতে সরকার পতনের মতো বড় পরিণতির দিকে গড়াবে?
এর সহজ উত্তর হলো, অবশ্যই পারে। কিন্তু ব্যাপারটা অন্য তিন দেশের মতো অত সহজ হবে না। এর মূল কারণ ভারতের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ কাঠামো। বাংলাদেশ বা নেপালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র প্রায় পুরোপুরি জাতীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত। বিপরীতে ভারত একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। রাজ্য সরকারগুলোর হাতে অনেক সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। একেক রাজ্যের নিজস্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার বিন্যাস এতই আলাদা যে, ভারত জুড়ে একটি অভিন্ন আন্দোলন বা অসন্তোষ দানা বাঁধতে সচরাচর দেখা যায় না। আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হলেও তা সহসা রাজ্য রাজনীতিতে, স্থানীয় নির্বাচনে বা আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থানে তা ছড়িয়ে পড়ে না। তার মানে, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্ষোভকে অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পথে শোষণ করে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ককরোচ ছাড়াও ভারতে নিকট অতীতে আরও কয়েকটি বড় আকারের আন্দোলন দানা বাঁধতে দেখা গেছে— যেমন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলন, শাহিনবাগ, কৃষক আন্দোলন কিংবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন। এগুলো সবই জোরালো গণআন্দোলন ছিল। সরকারকে চাপের মুখেও ফেলেছিল। কিন্তু তাতে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার মৌলিক ভারসাম্য টলেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে ককরোচ জনতা পার্টিকে একটি ক্ষণস্থায়ী ছাত্র আন্দোলন হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলনগুলো আমাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে। ফলে এখনই ভারতে বাংলাদেশ বা নেপালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন যাবে না, তেমনি ককরোচ জনতা পার্টিকে নিছক একটি সাময়িক বিক্ষোভ বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। বরং আপাতত এটিকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক মানসিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রাথমিক সংকেত হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।




