বাঙালির দুর্গোৎসবের ইতিহাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শরতের শিশিরভেজা ভোর, শিউলি ফুলের সুবাস আর আকাশে মেঘের খেলায় প্রতি বছর বাঙালির দ্বারে ফিরে আসে শারদীয় দুর্গাপূজা। বর্তমান যুগে দুর্গাপূজা মানেই বর্ণিল আলোকসজ্জা, আধুনিক থিম প্যান্ডেল আর লাখো মানুষের উচ্ছ্বাসের মহাসমারোহ। তবে এই জমকালো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পেছনে রয়েছে বহু শতাব্দীপ্রাচীন এক সমৃদ্ধ ইতিহাস, যার শিকড় প্রোথিত আমাদের লোকজঐতিহ্য ও সামাজিক বিবর্তনের গভীরে। বৈদিক যুগের নির্জন আরাধনা থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বজনীন সার্বজনীন উৎসবে রূপান্তরের এই ঐতিহাসিক যাত্রাটি শুধু কোনো ধর্মীয় রীতিনীতির গল্প নয়; বরং এটি বাংলা ও বাঙালি সমাজমানসের পরিবর্তনের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।
পৌরাণিক ও বৈদিক শাস্ত্রের পাতা ওল্টালে দুর্গাপূজার আদি রূপের সন্ধান পাওয়া যায়, যা তৎকালীন যুগে আজকের মতো মহাসমারোহে উদযাপিত হতো না। ঋগ্বেদের দেবীসূক্ত এবং মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত শ্রীশ্রী চণ্ডীতে দেবী দুর্গার মহিষাসুর মর্দিনী রূপের আদি বর্ণনা রয়েছে। তবে তৎকালীন সমাজে এই পূজা মূলত রাজা, সামন্ত বা ঋষি-মুনিদের ব্যক্তিগত কিংবা নির্দিষ্ট স্বার্থভিত্তিক সাধনার বিষয় ছিল। মধ্যযুগে কবি কৃত্তিবাস ওঝা যখন বাংলা ভাষায় রামায়ণ অনুবাদ করেন, তখন তিনি বাল্মীকি রামায়ণের মূল রূপ থেকে কিছুটা সরে এসে রামচন্দ্রের শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধনের কাহিনিটি যুক্ত করেন। লঙ্কাজয়ের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্রের এই অকালবোধন বাঙালির জনমানসে এতটাই গভীরভাবে প্রভাব ফেলে যে, বসন্তকালের বাসন্তী পূজাকে পেছনে ফেলে শরৎকালের দুর্গাপূজাই বাঙালি হিন্দু সমাজে মুখ্য হয়ে ওঠে। ষোড়শ শতকে লেখা রঘুনন্দনের স্মার্ত গ্রন্থেও দুর্গাপূজার সুনির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় বিধানের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, সে সময় থেকেই পূজাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করেছিল।
বৈদিক যুগের নির্জন আরাধনা থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বজনীন সার্বজনীন উৎসবে রূপান্তরের এই ঐতিহাসিক যাত্রাটি শুধু কোনো ধর্মীয় রীতিনীতির গল্প নয়; বরং এটি বাংলা ও বাঙালি সমাজমানসের পরিবর্তনের এক অনন্য দলিল
বাংলায় আধুনিক ও আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গাপূজার সূচনা মূলত মোগল ও ঔপনিবেশিক আমলের জমিদার ও ধনকুবেরদের হাত ধরে। ১৫৮৩ সালে রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ এবং প্রায় একই সময়ে নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার তৎকালীন সময়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রথম মহাসমারোহে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। কংসনারায়ণের এই পূজায় প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে ইতিহাসে তথ্য পাওয়া যায়, যা তখনকার দিনে ছিল এক অকল্পনীয় অঙ্ক। পরে ঔপনিবেশিক আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেনিয়া এবং স্থানীয় বিত্তশালী জমিদারদের প্রতিপত্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে দুর্গাপূজা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ের পর লর্ড ক্লাইভকে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে রেখে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ীতে রাজা নবকৃষ্ণের দুর্গোৎসব উদযাপিত হয়। এই রাজবাড়ীর পূজাগুলো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না; বরং এগুলো ছিল অভিজাত শ্রেণির সামাজিক অবস্থান, ক্ষমতা ও ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা জাহির করার এক জমকালো মঞ্চ।
অভিজাতদের দুর্গাপূজা যখন সাধারণ মানুষের কাছে অধরা স্বপ্ন ছিল, ঠিক তখনই জন্ম নেয় ‘বারোয়ারি’ বা জনসাধারণের দুর্গোৎসবের চেতনা। ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় ১২ জন বন্ধু বা সহপাঠী মিলে চাঁদা তুলে
সাধারণ মানুষের জন্য যে পূজার সূচনা করেন, সেটিই ইতিহাসে প্রথম ‘বারোয়ারি পূজা’ নামে পরিচিতি পায়। ‘বারো ভাই’ বা ১২ জন অংশীদারের উদ্যোগ থেকে উদ্ভূত এ ধারণাই পরে ১৯০৯ সালে কলকাতার সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার হাত ধরে জন্ম দেয় আজকের ‘সার্বজনীন দুর্গাপূজা’র। সামন্তবাদী কাঠামোর বাইরে এসে সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতায় পূজা আয়োজনের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন উৎসবটিকে হঠাৎ করেই সর্বস্তরের মানুষের আপন করে তোলে। জমিদারদের বৈঠকখানার চার দেয়াল ভেঙে পূজা চলে আসে পাড়ার উন্মুক্ত মাঠে; যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
বিশ শতকের মাঝামাঝি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুর্গাপূজাকে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রায় উন্নীত করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় কলকাতার বিভিন্ন ব্যায়ামাগার ও ক্লাবের তরুণরা দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হতে শুরু করেন; যেখানে দেবী দুর্গা শুধু আরাধ্যা দেবী হিসেবে নয়; বরং অত্যাচারী ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে মাতৃভূমির পরাক্রমশালী রূপক হিসেবে বিবেচিত হতেন। অরবিন্দ ঘোষ, সুভাষচন্দ্র বসু এবং স্বামী বিবেকানন্দের মতো মনীষীদের চিন্তাধারায় দেবী দুর্গা হয়ে উঠেছিলেন শক্তির প্রতীক ও দেশমাতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পাকিস্তান আমলে এবং পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-উত্তরকালেও দুর্গোৎসব বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক সংহতি ও হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দুর্গাপূজা আজ আর শুধু কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক মহোৎসবে, যা বিশ্বদরবারেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২১ সালে ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপূজাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে ঘোষণা করে, যা এই উৎসবের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ও রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক দলিল। বৈদিক যুগের ব্যক্তিকেন্দ্রিক আরাধনা, মোগল-ব্রিটিশ আমলের জমিদারি আড়ম্বর, বিশ শতকের বারোয়ারি উদ্যোগ এবং বর্তমান যুগের নান্দনিক থিম পূজার বিবর্তন প্রমাণ করে, দুর্গাপূজা যুগের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ক্রমাগত নতুন করে গড়ে তুলেছে। ইতিহাসের এই সোনালি পথচলাই দুর্গোৎসবকে চিরন্তন ও সার্বজনীন এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।
লেখক: শিক্ষার্থী, হাবীবুল্লাহ্ বাহার কলেজ, ঢাকা



