রাজনীতির ভাষার ‘ডটিকরণ’

মেহের আফরোজ শাওনের সূত্র ধরে সেই পুরনো তর্কটা আবার ফিরে এসেছে— রাজনৈতিক আর মতাদর্শিক আলাপে, প্রচারে বা স্লোগানে কি অশ্লীল গালাগাল ব্যবহার করা যাবে? গালাগাল কি রাজনীতির পরিভাষা হতে পারে? রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্টরা প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষকে অশ্লীল গালি দিতে পারেন? স্লোগানের ভাষায় কি গালাগাল থাকতে পারবে?
ব্যাপারটা শুধু নৈতিক ঔচিত্যবোধের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই তর্ক প্রথম উঠেছিল বছরখানেক আগে ওসমান হাদিকে ঘিরে, যখন তিনি শাহবাগে প্রকাশ্য জনসমাবেশে ‘শ’ বর্গীয় একটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু তারও আগে জুলাই আন্দোলনের দেয়াললিখনে আমরা রাজনৈতিক পরিভাষার পরিবর্তন লক্ষ করতে শুরু করি। অনেকের কাছে সেটি ছিল একটি জেনারেশনাল শক বা প্রজন্মগত অভিঘাত। কিন্তু এটি শুধুই প্রজন্মগত সাংস্কৃতিক অভিঘাতের বিষয় নয়। এ তর্কের শিকড় আরও গভীরে। অনেকে বলেছেন, সমাজে মানুষের ভাষার ভেতরে যে অশ্লীল গালাগালের অস্তিত্ব আছে, সেটি তো আর অস্বীকার করার জো নেই। ভাষা নিজে কোনো পবিত্র বিষয় নয়। তার কাজ যোগাযোগ করা। তাহলে রাজনৈতিক পরিসরে ভাষিক শুচিবাইয়ের অর্থ কী? মানুষ তার ক্রোধ, শ্লেষ ও বিদ্রোহ নিখুঁত অব্যর্থ নিশানায় কীভাবে ছুড়ে দেবে, যদি সে অশ্লীল গালি দিয়ে উঠতে না পারে?
আরেক দল বললেন, রাজনৈতিক ভাষার ক্রমবর্ধমান অশালীনতা, গালাগাল, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও স্ল্যাংয়ের এই যে স্বাভাবিকীকরণ— এটাই বিপ্লব। এর মধ্য দিয়ে রুচির উচ্চম্মন্যতা আর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দুর্গে হানা দিচ্ছে সমাজের নিচুতলার লোকরা। রাজনীতিবিদরা অশ্লীল খিস্তি করছেন মানে, তারা জনগণের ভাষায় কথা বলছেন। তারা জনতার কাতারে নেমে আসছেন।
অনেকে আবার বিষয়টিকে গণতন্ত্র, ভাষা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং যোগাযোগতত্ত্বের আলোচনায় টেনে নিতে চান। আমি অত গভীরে আলোচনার বদলে শুধু এটুকু বলব যে, আমাদের দেশে রাজনীতির ভাষার এই অশ্লীলায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এক দশক ধরে এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা, যার শুরুটা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয়বারের নির্বাচনী প্রচারে প্রকাশ্যে একের পর এক অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে ট্রাম্প শ্রোতাদের বিস্ময় ও মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছেন। পেয়েছেন হাততালি। তার লোকজন বলেছেন, ট্রাম্প পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ধার ধারেন না। কিন্তু এই প্রবণতা ট্রাম্পের মধ্যে সীমিত থাকেনি। গত বছর নির্বাচনী প্রচারের সময় বার্তা সংস্থা এপি এক প্রতিবেদনে জানায়, বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও প্রকাশ্যে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ‘শিটহোল’ বা ‘গুয়ের ডিব্বা’ শব্দটি প্রকাশ্যেই উচ্চারণ করে থাকেন। এখন দেখা যাচ্ছে, ক্রমেই আমেরিকার অন্য রাজনীতিবিদরাও অনুপ্রাণিত হয়ে প্রায়ই এমন সব স্ল্যাং উচ্চারণ করছেন, যেটি পত্রিকার পাতায় ছাপতে কিছু অক্ষর উহ্য রাখতে হচ্ছে এবং সেখানে ‘ডট ডট’ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এটিকে বলা যাক রাজনীতির ভাষার ‘ডটিকরণ’। কিন্তু এই ‘ডটিকরণ’ ঘটছে কেন? যারা বললেন, এটি সমাজের নিচের তলার লোক বা সাবঅল্টার্নদের উঠে আসার, তাদের রাজনীতির ময়দান দখলের স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, তারা কি এই দাবি করবেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকায়ও সাবঅল্টার্ন বিপ্লব সংঘটিত হচ্ছে? রাজনীতির ডটিকরণে কি আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপ্রসাদ লাভ করতেই থাকব, নাকি কিছুটা উদ্বিগ্ন হব?
এর জবাব দেওয়ার আগে এই প্রবণতার কারণ অনুসন্ধান প্রয়োজন। সেটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী আর মনস্তত্ত্ববিদদের কাজ। আমার ধারণা, এর পেছনে আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতি। অনলাইনের নিজস্ব অ্যালগরিদম আপনাকে দেখাচ্ছে, আপনি কোনো মতামত প্রদানে যতই অকপট ভাষা প্রয়োগ করবেন, যতই রাগ বা ক্ষোভ দেখাবেন, ততই সেটির রিচ বা যোগাযোগের চৌহদ্দি বাড়বে। ফলে অনলাইনে ভাষা ঢালু হয়ে নিচের দিকে গড়াতে থাকে। এটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষার স্বাভাবিক প্রবণতা। এ কারণে অতি ভদ্রলোকও ধীরে ধীরে ফেসবুকে প্রগলভতা প্রদর্শন করতে শুরু করেন। কারণ যোগাযোগ নয়, এখানে মনোযোগই মূল পুঁজি।
অনেকে ভাষার এই ডটিকরণের পেছনে বিশ্ব জুড়ে পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থানকে দায়ী করেন। পপুলিস্ট নেতারা দেখাতে চান, তারা এলিট নন। এটি দেখানোর সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো অশালীন ভাষার প্রয়োগ। এতে দুটি কাজ হয়। প্রথমত, বলা হয় দেখ, আমি জনতার কাতারে নেমে এসেছি। আর দ্বিতীয়ত, আমি অকপট। আমার মধ্যে কোনো ভান-ভণিতা নেই। অর্থাৎ গালি এখানে টুলস বা কৌশল।
আমাদের দেশে রাজনীতির ভাষার ‘ডটিকরণের’ পেছনে আরেকটি বাড়তি কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বটবাহিনীর কর্মকাণ্ড। রাজনৈতিক সক্রিয়তার অংশ হিসেবে কৃত্রিমভাবে মতামত সৃষ্টির এই প্রবণতা একধরনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন। এটি রাজনৈতিক পরিভাষার অবিশ্বাস্য তিক্তায়ন ঘটাচ্ছে।
চূড়ান্ত প্রশ্ন হচ্ছে, যা ঘটছে তা ভালোই হচ্ছে ভেবে আমরা প্রশান্তিতে গা এলিয়ে দেব, নাকি উদ্বিগ্ন হব। আমার মনে হয়, উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ অশ্লীল গালি যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়, ভাষার ভেতরে এর অতিব্যবহার ঘটলে, সেটির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। গালির আর ধার থাকবে না। তখন রাজনীতি ও মতাদর্শিক আলোচনা কলপাড়ের ঝগড়ায় পরিণত হবে।




