সুনীল: ভালোবাসার যুগ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পাঁচের দশকে যারা লেখালেখি করতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কফি হাউজ ছিল তখন আমাদের আড্ডার জায়গা। কারণ, তখন আমাদের সবার অর্থনৈতিক অবস্থাই যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ। এক কাপ কফির পয়সাও সবার পকেটে থাকত না।
ভাগাভাগি করে খেতে হতো। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও কেউ হুড়ো দিত না। ওইখানেই আমাদের বেশিরভাগ বন্ধুত্বের সূচনা।
সুনীল তখন অনিয়মিতভাবে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা বের করে। শীর্ণ কবিতার পত্রিকা। তার রোজগার বলতে টিউশনি আর কোনো অনামা পত্রিকায় সামান্য বেতনের চাকরি। শক্তির অবস্থা আরও খারাপ।
সুনীল তখন শুধুই কবি। কবিতা লিখতও চমৎকার। আর কৃত্তিবাসকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল একদল নতুন কবিদের বলয়। তাতে অলোকরঞ্জন, প্রণবেন্দু, শরৎ, তারাপদ, প্রণব, শক্তি, নবনীতা, বিজয়া, শঙ্কর, কবিতা, দিব্যেন্দু, শঙ্খ ঘোষ, শিবশঙ্কর এবং আরও অনেকেই ছিল। সুনীল বরাবরই একটু মোটাসোটা এবং শান্ত ও ভদ্র মানুষ। মদ্যপান না করলে তাকে বড় একটা প্রগলভ হতে কখনোই দেখিনি। আরও একটা অদ্ভুত গুণ ছিল তার। বাক্যবাগীশ না হয়েও সে মানুষকে আকর্ষণ করতে পারত। এই ম্যাগনেটিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী খুব কম মানুষই হয়। কারণ এই সম্পদ জন্মগত, চেষ্টা করেও অর্জন করা যায় না। সেজন্যই সুনীলের বন্ধু ছিল অনেক। পরে সেই বন্ধুত্বের বলয় দেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ব্যক্তি সুনীলের আর একটা মস্ত গুণ ছিল, সহানুভূতি। অন্যের দুঃখ-দুর্দশায় সে বরাবরই সাধ্যমতো সাহায্য করতে চেষ্টা করত। একসময়ে সে ঘোষণা করে দিয়েছিল, যেকোনো বেকার যুবক যদি আন্দামানে ভাগ্যান্বেষণে যেতে চায়, তবে সে তাকে ১ হাজার টাকা নগদ আর জাহাজভাড়া দেবে। যতদূর জানি, কয়েকজনকে সে তা দিয়েও ছিল। আন্দামান তখনো জনবহুল হয়নি এবং কৃষি ও ব্যবসার জন্য অনেক পথ খোলা ছিল।
ওই সময়ে আমরা যারা কবিতা বা গদ্য লিখতাম, তারা সবাই ছিল অর্থনৈতিকভাবে অতিশয় দুর্বল। যদিও প্রাণচাঞ্চল্যের অভাব ছিল না। আর ওই বয়সে সবাই তো স্বপ্নদর্শী! ওই স্বপ্ন আর লেখার তাগিদই ছিল আমাদের সম্বল। আমাদের বয়স তখন তেইশ-চব্বিশ বা পঁচিশ হতে পারে। সেই সময়ে আমেরিকার আইওয়া ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপক এসে হাজির। তিনি পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরে সম্ভাবনাময় কবি-সাহিত্যিক নির্বাচন করছেন। নির্বাচিতদের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের লেখালেখির কাজই করতে হবে, সব খরচই বহন করবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়। শেষে একটা গবেষণাপত্র জমা দিতে হবে। তিনি কফি হাউজে এসে নিয়মিত আমাদের সঙ্গে মিশতেন এবং আমাদের সবাইকে জরিপও করে নিতেন। যথারীতি তিনি সুনীলকেই নির্বাচন করলেন আর সুনীল ছয় মাসের জন্য আমেরিকা চলে গেল। আর ওই আমেরিকার স্বল্প প্রবাস তার জীবনে অনেক কিছুই যোগ করেছিল। সুনীলের মুখেই শুনেছি, আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়ার প্রস্তাবও তাকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার সাফ কথা, আমি বাংলায় লিখি, আমেরিকায় থেকে আমার কী হবে? এখানে বাংলা পড়বে কে? সুনীল আইওয়াতে একজন ফরাসি মেয়ের প্রেমেও পড়েছিল, হয়তো তাকেই বিয়েও করত সে। কিন্তু পরে ফ্রান্সে তার সন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারে, মেয়েটি বেঁচে নেই। ‘সুদূর ঝরনার জলে’ উপন্যাসে সেই বিবরণ আছে।
মনে হয়, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে আগে বিয়ে করেছিল সুনীলই। আসলে স্বাতীই সুনীলের প্রেমে পড়েছিল এবং বিবাহপ্রস্তাবও ছিল তারই। স্বাতী সম্ভ্রান্ত ধনী পরিবারের মেয়ে বলে সুনীলের দ্বিধা ছিল একটু। সেটি কাটিয়ে উঠে দুজনেই সুন্দর জোড়া লেগে গেল। আমি যতদূর দেখেছি, তাদের দাম্পত্যও ছিল চমৎকার। স্বাতীর মতো এমন ভালো মানুষ খুব কম দেখা যায়। আমাদের মধ্যে সুনীলই সবার আগে গাড়ি কিনেছিল, সবার আগে ফ্ল্যাট কিনেছিল এবং সবার আগে অভিজাত সমাজে প্রবেশ করতে পেরেছিল। এর জন্য তাকে প্রচণ্ড পরিশ্রমও করতে হয়। কবি সুনীল তখন ঔপন্যাসিক, কিশোর সাহিত্যিক, ফিচার লেখক। জনপ্রিয়তায় তখন সর্বাগ্রগণ্য। বইয়ের বিক্রিও তুখোড়।
তা বলে এমন নয় যে, অভিজাত সমাজের একজন হয়ে সে পাল্টে গিয়েছিল। তেমনটা মনে হয়নি আমার। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না সুনীল কেন সেন্সর বোর্ডের মেম্বার হয়ে দিনের পর দিন অসংখ্য সিনেমা দেখে বেড়াত? কেনই-বা সাহিত্য আকাদেমির আহ্বায়ক এবং পরে তার সভাপতি হয়ে সময় ও উদ্যমের এত অপচয় ঘটাত? আমি বহুবার তাকে বলেছি, ‘আপনি এই অকাজের কাজগুলো করেন কেন? এতে তো আপনার সময় নষ্ট ছাড়া কিছু নয়। লোকে কি আপনাকে সাহিত্য আকাদেমির প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখবে, নাকি সাহিত্যিক হিসেবে?’ শুনে সুনীল চুপ করে থাকত। একটু চিন্তিত দেখাত তাকে।
‘দেশ’ পত্রিকার ঘরে আমি আর সুনীল পাশাপাশি বসতাম। সুনীল অ্যাসোসিয়েট এডিটর, আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর। সন্ধ্যার পর সবাই চলে গেলে মাঝে মাঝে সুনীলের সঙ্গে আমার একান্তে কিছু কথা হতো। সুনীল ঘোর নাস্তিক এবং আমি গুরুবাদী আস্তিক। আমি নিরামিষাশী, সুনীল সর্বভুক। তবু বন্ধুত্বের কোনো বাধা হয়নি কখনো। আর কখনো ঝগড়া-বিতর্কও হতো না। তবে আলোচনায় অনেক দার্শনিক বিষয়ও থাকত। তখন মনে হতো, সুনীল সম্ভবত খুব কঠোর নাস্তিক নয়। একটু দ্বিধা আছে কোথাও। আছে প্রশ্নের অবকাশ।
ওই ঘরে প্রতি শনিবার বিকালের দিকে ঝালমুড়ির আড্ডা বসে যেত। তাতে যোগ দিত দিব্যেন্দু পালিত, পার্থ বসু এবং আরও অনেকে। সে এক তুমুল হাস্যরসাত্মক আড্ডা। সেই আড্ডার অনেক নীরব শ্রোতাও জুটে যেত। আবডালে আমি সুনীলকে ‘মোটকু’ বলে উল্লেখ করতাম। সেটি লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়েছিল। সুনীলও জানত, তবে কিছু মনে করেনি কখনো।
অমিত মদ্যপান এবং খাদ্যাখাদ্যের অবিচার সুনীলের পক্ষে শুভ হয়নি। একটু-আধটু অসুস্থতা দেখা দিচ্ছিল, সুনীল পাত্তা দিত না। শরীরচর্চার বালাই ছিল না বলে ওজন বাড়ল। হাঁটু বদলাতে হলো। সত্তর বছর বয়সের পর তাকে বেশ কাহিল লাগত। তবে জীবনীশক্তি এবং মনের জোরে সে চলত। তার পঁচাত্তরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে মঞ্চে তার পাশেই বসে লক্ষ করলাম, সুনীলের হাত কাঁপছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাষণ দিতে উঠে বলেছিলাম, ‘সুনীল, আপনাকে কিন্তু আমাদের জন্যই বেঁচে থাকতে হবে আর বেঁচে থাকার জন্য যা যা করতে হবে, আপনাকে তাই করতে হবে কিন্তু।’ কথাটা শুনে সুনীল একটু বিচলিত হয়েছিল।
এরপর এলো সেই অন্তিম ক্ষণ। আচমকা মহানবমীর ভোররাতে চলে গেল সুনীল। আমাদের সেই পঞ্চাশের দশকের সবচেয়ে বর্ণময়, সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং অমিত শক্তিধর এক কবি ও গদ্যকার। তার অভাব পূর্ণ হওয়ার নয়।




