রাজনৈতিক পরিচয়ই রক্ষাকবচ নয়

ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কিংবা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। সাম্প্রতিক মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে দুই শতাধিক ব্যক্তির হামলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য সামগ্রী লুটের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার নামও মামলায় ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
ফেরদৌসী আহমেদও ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু ঘটনা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। ঘটনাটি তাই শুধু একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ নয়; বরং ক্ষমতাসীন দলের কেউ বিতর্কে জড়ালে সরকার নিজের লোকের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে পারে কি না, সে প্রশ্নে একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক বার্তা।
রাজনৈতিক বিতর্কে দল, প্রতীক ও ক্ষমতার হিসাব প্রাধান্য পেলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি মৌলিক। মানুষ থানায় কিংবা সরকারি অফিসে রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধা নিতে বা হয়রানির শিকার হতে চায় না। তার প্রত্যাশা, আইনের কাছে ধনি-গরিব কিংবা সরকারি দল-বিরোধী দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে মিরপুরের নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য মা ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল। সেখানে হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন বা সরঞ্জামের ক্ষতি নয়, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগের ওপরও আঘাত। এ ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নাম ওঠায় সরকারের দায়িত্ব আরও বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী যদি শুধু বিরোধী দলের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হন, তাহলে সেটিকে দলীয় রাজনীতির স্বাভাবিক হিসাব হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নিজের দলের একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত ভিন্ন বার্তা দেয়— ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব আছে আর দায়িত্বের সঙ্গে জবাবদিহিও আছে। তবে এ নীতি কার্যকর হবে তখনই, যখন তা একজন সংসদ সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মন্ত্রী, স্থানীয় নেতা ও প্রভাবশালী কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে।
কঠোরতার অর্থ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ নয়। বরং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সরকারি সম্পদ নষ্টের অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে ধরে নেওয়াও চলবে না। তদন্ত, প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেই চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। এটিই আইনের শাসনের প্রকৃত কঠোরতা।
রাড্ডাকাণ্ডের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতের পদক্ষেপে। ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি একই নীতি বজায় থাকে তাহলে ঘটনাটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে
সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ ও মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের উদাহরণ প্রায়ই দৃঢ় নেতৃত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোচনায় আসে। তাদের শাসনব্যবস্থা নিয়ে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে সমালোচনা থাকায় তাদের মডেল সরাসরি অনুকরণ করা বাংলাদেশের জন্য সমাধান নয়। তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
এসব ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার হিসাবের চেয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হয়। তবে দৃঢ় নেতৃত্ব ও স্বেচ্ছাচারী নেতৃত্ব এক নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সাহসী, আবার গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রতিও দায়বদ্ধ।
একজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর শুধু নিজের দলের প্রধানমন্ত্রী থাকেন না; তিনি পুরো দেশের প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা কোনো দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন— সব নাগরিকের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা তার সরকারের দায়িত্ব। রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়, রাষ্ট্র জনগণের। পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় দলীয় পরিচয় যেন নির্ধারক না হয়, সেটিই সুশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
রাড্ডা-কাণ্ডে পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখার প্রতিক্রিয়া যেমন সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তেমনি বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠন করা। সাংগঠনিক শাস্তি ও আইনি বিচার এক বিষয় নয়।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে ইতিবাচক বলে মনে হয়। তবে একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এককভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের অনিয়ম দেখভাল করা সম্ভব নয়। সরকারের উদ্যোগ তখনই কার্যকর হবে, যখন দলের নেতাকর্মীরাও বুঝবেন, রাজনৈতিক পরিচয় অন্যায়ের সুরক্ষা দিতে পারে না।
রাড্ডা-কাণ্ডের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ভবিষ্যতের পদক্ষেপে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যদি একই নীতি বজায় থাকে, তাহলে ঘটনাটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে। মানুষ শুধু বক্তৃতা নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়— ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন।
একজন প্রধানমন্ত্রী সাময়িকভাবে প্রশংসা পেতে পারেন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্থায়ী আস্থা অর্জন করতে হলে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে অন্যায় করলে কেউ পার পাবে না এবং ন্যায়বিচার চাইতে কাউকে দলীয় পরিচয় দিতে হবে না। প্রধানমন্ত্রীর কঠোরতা তাই কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। রাড্ডা-কাণ্ডের পর জনগণের প্রত্যাশা, এই নীতি যেন একটি ঘটনার মধ্যে থেমে না থাকে; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
লেখক: ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা



