ডেঙ্গু, নগরায়ণ, রবীন্দ্রনাথ

লেখক ও চিত্রনাট্যকার শিবব্রত বর্মন
শহরে ডেঙ্গুর সিজন যে আবার চলে এলো, সেটা পত্রিকার পাতায় খবর দেখার আগে আমি টের পাই মহল্লার গলিতে ‘ম্যাজিক মশারি’ বিক্রেতা হকারের তীক্ষ্ণ হাঁকে আমার ভাতঘুম ভেঙে গেলে। আমি বুঝি, উড়ন্ত মশার দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকানোর এবং মশারি খাটিয়ে শোবার দিনগুলো আবার ফিরে এলো।
পত্রিকার পাতায় দেখলাম, মৌসুমের শুরুতেই সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বনানীতে কোনো এক নামকরা রেস্টুরেন্টে ঢুকে সেখানে ডেঙ্গু রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজননের ক্ষেত্র দেখতে পেয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানা করেছেন। নগর নিয়ন্ত্রকরা যে আগামী কিছুদিন বাসাবাড়ির ছাদে ছাদে অভিযান চালাবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া ফগার মেশিন হাতে বিকট শব্দে সাদা ধোঁয়া উদ্গীরণ করতে করতে মশক নিধন কর্মীরা গলিপথে নেমে পড়ে মশা আর মানুষের এক নিষ্ফল, অনন্ত যুদ্ধের ইতিহাস মনে করিয়ে দেবেন।
ডেঙ্গু রোগ প্রতি বছর বর্ষার সিজনে ফিরে আসে। আমি এটা ভেবে একটু অবাকই হই যে দেশে কবি-সাহিত্যিকদের কাছে সবচেয়ে রোমান্টিক মাসটিতেই কেন এরকম ভয়াবহ প্রকোপ ঘটে খুবই আনরোমান্টিক এই রোগের। হ্যাঁ, ডেঙ্গু খুব আনরোমান্টিক রোগ। অন্তত ম্যালেরিয়া নামক মশাবাহিত রোগের চেয়ে তো বটেই। বাঙালির দুই মহানগর ঢাকা এবং কলকাতায় ফি-বছর এ রোগ নিয়মিত হানা দিলেও বাঙলা সাহিত্যে কোথাও এর কোনো উল্লেখ নেই। কোনো সাহিত্যিক ডেঙ্গু নিয়ে কোনো গল্প, উপন্যাসের কাহিনি ফেঁদেছেন বলে অন্তত আমার চোখে পড়েনি। কারও স্মৃতিকথাতেও ডেঙ্গুর প্রসঙ্গ সেভাবে আসেনি। অথচ প্লেগ, যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কলেরা বা ম্যালেরিয়ার উল্লেখ বাঙলা সাহিত্যের পরতে পরতে পাওয়া যাবে।
আমার কাছে এটা খটকাই লাগে। অনেকে বলেন, এর মূল কারণ শুরুতে ডেঙ্গুকে একটা আলাদা রোগ হিসেবে শনাক্তই করতে পারত না চিকিৎসকরা। তারা এটাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা আর ম্যালেরিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলত। যখন আলাদা করতে সক্ষম হলো, তখন এ রোগের স্থানীয় নাম দাঁড়াল হাড়ভাঙ্গা জ্বর বা ব্রেকবোন ফিভার।
ডেঙ্গু একটা নাগরিক ব্যাধি। অট্টালিকাময় শহরের দ্রুত বেড়ে ওঠার সঙ্গে এর যোগ আছে। বাঙালির সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রথম মুলাকাতও হয়েছিল একটি শহরে, প্রায় ২০০ বছর আগে ১৮২৪ সালে, ঔপনিবেশিক কলকাতায়। প্রতি বছরই এটার কম-বেশি প্রকোপ দেখা দিত। পরে ১৮৩৬, ১৮৭২ আর ১৯০৬ সালে তিন দফায় কলকাতায় মহামারী আকারে দেখা দেয় ডেঙ্গু।
১৮৭২ সালের ডেঙ্গুর সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ১১ বছর। আক্রান্তের সংখ্যা হু-হু করে বাড়তে থাকলে কলকাতার এলিট পরিবারগুলো আতঙ্কে শহর ছাড়তে শুরু করে। এর মধ্যে জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারও ছিল। বালক রবীন্দ্রনাথসহ পুরো পরিবার কলকাতা থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তরে ব্যারাকপুরের কাছে পানিহাটি নামে একটি এলাকায় হুগলি নদীর তীরে এক বাগানবাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে।
আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘একবার কলকাতায় ডেঙ্গুজ্বরের তাড়ায় আমাদের বৃহৎ পরিবারের কিয়দংশ পেনেটিতে (পানিহাটিতে) ছাতুবাবুদের বাগানে আশ্রয় লইল। আমি তাহার মধ্যে ছিলাম।’
কলকাতার সংকীর্ণ গলির জীবন থেকে রবীন্দ্রনাথের সেটাই প্রথম বাইরে আসা। বিস্তীর্ণ প্রকৃতির রূপ তার মধ্যে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, আত্মজীবনীর পাতায় তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে: ‘এই প্রথম বাহিরে গেলাম। গঙ্গার তীরভূমি যেন কোন্ পূর্বজন্মের পরিচয়ে আমাকে কোলে করিয়া লইল। সেখানে চাকরদের ঘরটির সামনে গোটাকয়েক পেয়ারাগাছ। সেই ছায়াতলে বারান্দায় বসিয়া সেই পেয়ারাবনের অন্তরাল দিয়া গঙ্গার ধারার দিকে চাহিয়া আমার দিন কাটিত। প্রত্যহ প্রভাতে ঘুম হইতে উঠিবামাত্র আমার কেমন মনে হইত, যেন দিনটাকে একখানি সোনালিপাড়-দেওয়া নূতন চিঠির মতো পাইলাম। লেফাফা খুলিয়া ফেলিলে যেন কী অপূর্ব খবর পাওয়া যাইবে। পাছে একটুও কিছু লোকসান হয় এই আগ্রহে তাড়াতাড়ি মুখ ধুইয়া বাহিরে আসিয়া চৌকি লইয়া বসিতাম। প্রতিদিন গঙ্গার উপর সেই জোয়ারভাঁটার আসা যাওয়া, সেই কত রকম-রকম নৌকার কত গতিভঙ্গি, সেই পেয়ারাগাছের ছায়ার পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে অপসারণ, সেই কোন্নগরের পারে শ্রেণীবদ্ধ বনান্ধকারের উপর বিদীর্ণবক্ষ সূর্যাস্তকালের অজস্র স্বর্ণশোণিতপ্লাবন। এক-একদিন সকাল হইতে মেঘ করিয়া আসে; ওপারের গাছগুলি কালো; নদীর উপর কালো ছায়া; দেখিতে দেখিতে সশব্দ বৃষ্টির ধারায় দিগন্ত ঝাপসা হইয়া যায়, ওপারের তটরেখা যেন চোখের জলে বিদায়গ্রহণ করে; নদী ফুলিয়া উঠে এবং ভিজা হাওয়া এপারের ডালপালাগুলার মধ্যে যা-খুশি-তাই করিয়া বেড়ায়।
কড়ি-বরগা দেয়ালের জঠরের মধ্য হইতে বাহিরের জগতে যেন নূতন জন্মলাভ করিলাম। সকল জিনিসকেই আর-একবার নূতন করিয়া জানিতে গিয়া, পৃথিবীর উপর হইতে অভ্যাসের তুচ্ছতার আবরণ একেবারে ঘুচিয়া গেল।’
বোঝা যায়, এ অভিজ্ঞতা বালক কবির মনে গভীর রেখাপাত করেছিল এবং হয়তো এর প্রভাব তার কবিমানস গঠনে ভূমিকা রেখে থাকবে। সেদিক থেকে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে ডেঙ্গু রোগের যে একটা পরোক্ষা ভূমিকা আছে, সেই দাবি আমি করতেই পারি।
তবে পরবর্তী দেড়শ বছরের সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্যে এ রোগের কোনো উল্লেখ আমরা আর পাই না। যেন সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে সাব্যস্ত করেছে একটা বিশেষ রোগকে তারা আড়াল করে রাখবে। বাংলার প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক পশ্চিমা চিকিৎসা পদ্ধতির দ্বন্দ্ব নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরোগ্য নিকেতন’-এ আমরা ম্যালেরিয়া, গুটিবসন্ত, হাম, কলেরা, যক্ষ্মা থেকে শুরু করে হেন রোগ নাই, যার উল্লেখ পাই না— কিন্তু ডেঙ্গু? নৈব নৈব চ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগ সুদূর আফ্রিকা থেকে বাংলায় এসেছে জাহাজে চেপে। ইউরোপীয় বণিকরা এদেশে ব্যবসা করতে আসার জন্য একসময় পুরো উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আসত। পথিমধ্যে রসদের জন্য আফ্রিকার নানান বন্দরে তাদের থামতে হতো। আর এভাবে জাহাজের খোলে করে উপমহাদেশে পৌঁছায় ডেঙ্গু রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশা।
উপমহাদেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় ঢাকায় ডেঙ্গুর আগমন অনেক সাম্প্রতিক ঘটনা। এর একটা কারণ ঢাকা দ্রুতগতির নগরায়ণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে অনেক পরে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর ঢাকার প্রথম বর্ধিষ্ণু নগরায়ণ ঘটতে শুরু করে। এ কারণে আমরা দেখি ডেঙ্গুর প্রথম আতঙ্কজনক প্রকোপ ঘটে ১৯৬০ এর দশকে। তখন এটা ‘ঢাকা ফিভার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিক থেকে ঢাকায় দ্বিতীয় দফা আগ্রাসী আবাসন শুরু হয়। মিরপুর আর মোহাম্মদপুর এলাকায় দ্রুত অপরিকল্পিত বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। আবাসন ব্যবসায়ীদেরও আমরা রমরমা দেখতে শুরু করি। এর প্রভাবে ২০০০ সালে আরেক দফা ডেঙ্গুর মহামারী দেখা দেয়। সেবার শুধু ঢাকাতেই সাড়ে ৫ হাজার লোক আক্রান্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিল ৯৩ জন।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকায় আরেক নতুন পরিস্থিতি দেখা দেয়। শুরু হয় সরকারি উদ্যোগে বিশাল আকারের অবকাঠামোগত নির্মাণযজ্ঞ। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৯, ২০২৩ সালে আমরা অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই বছর ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী প্রকোপ দেখেছি।
আমরা ডেঙ্গুকে যতই ভুলে থাকতে চাই না কেন, বণিক আর ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে এ দেশে আসা এই রোগ আমাদের পিছু ছাড়ছে না। অনেকে বলেন, ডেঙ্গু আসলে রোগ নয়। এটা আমাদের নাগরিক জীবনশৈলীর একটা ফল মাত্র। একটা অভিশাপ। এই অভিশাপ আমরা এখন দ্রুত রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছি। কেননা নগরায়ণের স্রোত এখন রাজধানীর বাইরে দেশময় ছড়িয়ে পড়ছে। পুরো দেশ এক বিরাট, বিকট, নিদ্রাহীন শহর হয়ে উঠছে।




