শুধু শিক্ষা নয় প্রয়োজন সুশিক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমরা প্রায়ই বলি— শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। কথাটি নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং মানুষের আচরণ আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি প্রশ্ন হাজির করেছে— কেমন শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড? কারণ শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দিতে পারে, দক্ষ করে তুলতে পারে, একটি ভালো চাকরি বা পেশার জন্য প্রস্তুত করতে পারে; কিন্তু সেই শিক্ষা যদি মানুষের বিবেক জাগ্রত না করে, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য না শেখায়, দায়িত্ববোধ তৈরি না করে, তবে সে শিক্ষা কি সত্যিই একটি জাতির মেরুদণ্ড হয়ে উঠতে পারে? আমার কাছে তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে জরুরি উচ্চারণ হলো— শুধু শিক্ষা নয়, প্রয়োজন সুশিক্ষা।
সুশিক্ষা মানে শুধু ভালো ফল নয়, ভালো মানুষ হয়ে ওঠা। একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় কোনো স্কুলভবন নয়, তার পরিবার। আর প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা। শিশু কথা বলা শেখার আগেই আচরণ শেখে। তাই সন্তানকে শুধু ‘সত্য কথা বলবে’ বললেই হবে না; তাকে সত্য বলার পরিবেশও দিতে হবে। তাকে শুধু ‘অন্যায় করবে না’ বললেই হবে না; তাকে দেখাতে হবে অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার সাহস কাকে বলে।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমি জানি, একটি ভবনের দৃঢ়তা নির্ভর করে তার ভিত্তির ওপর। ভিত্তি দুর্বল হলে ওপরের তলা যত সুন্দরই হোক, স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা একই। শিশুকালের মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা ও নৈতিক ভিত্তিই পরবর্তী জীবনের চরিত্র নির্মাণ করে। আমাদের দেশে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এবং ডিগ্রি অর্জন করছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের নিজেদের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখতে হবে— শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে কি নৈতিকতারও বিস্তার ঘটছে?
কারণ আমরা এমন অনেক মানুষকে দেখতে পাই, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যন্ত উঁচু; কিন্তু আচরণে তার প্রতিফলন নেই। সমস্যা শিক্ষায় নয়; সমস্যাটি শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রয়োগে। যে শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের সাফল্যের কথা ভাবতে শেখায়, কিন্তু অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখায় না, তা অসম্পূর্ণ শিক্ষা। প্রকৃত জ্ঞান মানুষের অহংকার বাড়ায় না; বরং বিনয় বাড়ায়।
আজ আমাদের সমাজে মতের অমিলকে অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নিতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য মতপার্থক্য থেকেও অসহিষ্ণুতা, অপমান কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণের জন্ম হয়। অথচ শিক্ষার অন্যতম বড় উদ্দেশ্য হওয়া উচিত যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ করা এবং অন্যের মত শোনার মানসিকতা তৈরি করা। একজন সত্যিকার সুশিক্ষিত মানুষ জানেন, আমি ভুলও করতে পারি। তাই তিনি প্রশ্ন করতে পারেন, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে নিজেকে সংশোধন করতে পারেন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আমরা অনেক সময় শিক্ষার্থীর চেয়ে পরীক্ষার্থী তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ি। পরীক্ষায় ভালো ফল করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভালো ফলই শিক্ষার শেষ কথা নয়। একজন শিক্ষার্থী কেন পড়ছে? শুধু একটি ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য? নাকি পৃথিবী, মানুষ, সমাজ ও নিজের জীবনকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য? জ্ঞান যদি শুধু পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার সামাজিক মূল্য খুব সীমিত। আমাদের সন্তানদের তাই শুধু জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, ‘কত নম্বর পেয়েছ?’ মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করা উচিত, ‘আজ কী শিখলে?’ ‘কাকে সাহায্য করলে।’ ‘কোনো ভুল করলে তা থেকে কী শিক্ষা নিলে’— এ প্রশ্নগুলোর মধ্যেই সুশিক্ষার বীজ লুকিয়ে রয়েছে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমরা অনেক সময় শিক্ষার্থীর চেয়ে পরীক্ষার্থী তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ি। পরীক্ষায় ভালো ফল করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ
সুশিক্ষিত মানুষ অন্যের নির্দেশের অপেক্ষায় সবসময় বসে থাকেন না। তার মধ্যে নিজেকে সংশোধন করার ক্ষমতা থাকে, নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার সাহস থাকে। তিনি জানেন, আইনের ভয় যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও বড় হলো নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। একজন মানুষকে সুশিক্ষিত করার সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই আসে, যখন কেউ তাকে না দেখলেও সে সঠিক কাজটি করে।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা কিংবা বড় অবকাঠামো দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এগুলো উন্নয়নের দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত তার মানুষের চরিত্র, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতায়। আমরা যদি দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করি, কিন্তু তিনি দায়িত্বশীল না হন; দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করি, কিন্তু তার মধ্যে মানবিকতা না থাকে; মেধাবী প্রশাসক তৈরি করি, কিন্তু ন্যায়বোধ দুর্বল থাকে; উচ্চশিক্ষিত ব্যবসায়ী তৈরি করি, কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকে— তাহলে শুধু শিক্ষার পরিসংখ্যান দিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন দক্ষতার সঙ্গে নৈতিকতা, জ্ঞানের সঙ্গে মানবিকতা এবং মেধার সঙ্গে দেশপ্রেমের সমন্বয়।
সুশিক্ষার আলোচনায় শিক্ষকদের ভূমিকা আলাদা করে বলতে হয়। একজন ভালো শিক্ষক শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করেন। তিনি প্রশ্ন করতে শেখান, যুক্তি করতে শেখান, ভুল থেকে শিখতে শেখান এবং সবচেয়ে বড় কথা— মানুষকে ভালোবাসতে শেখান। একজন শিক্ষক হয়তো একটি শ্রেণিকক্ষে কয়েক ডজন শিক্ষার্থীকে পড়ান; কিন্তু তার একটি কথা, একটি আচরণ কিংবা একটি আদর্শ একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ একজন শিক্ষক মূলত ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির কারিগর।
আমরা এখন এমন একসময়ে বাস করছি, যখন তথ্য পাওয়া কঠিন নয়। একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে পৃথিবীর অসংখ্য তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয় চলে আসে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। আর জ্ঞান ও প্রজ্ঞাও এক জিনিস নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে সন্তান কী জানছে— তার পাশাপাশি সে কীভাবে সেই জ্ঞান ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি একজন মানুষকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু নৈতিকতা না থাকলে সেই শক্তি ভুল পথেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের সন্তানদের শুধু ডিজিটাল দক্ষতা নয়; ডিজিটাল নৈতিকতা, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস, দায়িত্বশীল যোগাযোগ এবং মানবিক মূল্যবোধও শেখাতে হবে।
এ প্রশ্নটি প্রতিটি পরিবারকে করতে হবে। আমরা কি শুধু চাই সন্তান বড় চাকরি করুক? বড় ব্যবসা করুক? অনেক অর্থ উপার্জন করুক? সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক? অবশ্যই চাইব। কিন্তু তার সঙ্গে কি চাইব না যে সে একজন সৎ মানুষ হোক? অসহায়ের পাশে দাঁড়াক? অন্যের অধিকারকে সম্মান করুক? নিজের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের কথাও ভাবুক? দেশকে ভালোবাসুক? একজন সন্তান যদি অনেক অর্থের মালিক হয় কিন্তু মানুষের কষ্ট বুঝতে না পারে, তাহলে তার সাফল্য অসম্পূর্ণ। একজন মানুষ যদি উচ্চপদে পৌঁছেও অন্যায়কে অন্যায় বলতে না পারেন, তাহলে তার শিক্ষার কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়ে গেছে। আমাদের তাই সন্তানদের শুধু ‘জীবনে বড় হও’ বলা যথেষ্ট নয়। বলতে হবে ‘জীবনে বড় হও, কিন্তু মানুষ হিসেবেও বড় হও।’
লেখক: সংসদ সদস্য, নরসিংদী-৫ (রায়পুরা)




