কিশোর বিদ্রোহ থেকে গ্যাং কালচার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জীবনের সব পর্বের মতো কৈশোরেরও আছে নিজস্ব ধর্ম। কী চায় কিশোর এবং কিশোরী? এ বয়সটা নিজেকে চেনার যেমন, তেমনি চেনানোরও। সুযোগ পেলেই পারঙ্গমতার প্রমাণ দাখিলেরও। তাই নিরাপত্তার নামে প্রচলিত কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রায় পরিবারেই কিশোর, ইদানীং এমনকি কিশোরী সদস্যদের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়ে যায়। তারা আসলে উদীয়মান ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি চায়— গতানুগতিক ছকের বাইরে কিছু করতে চায়, করে দেখাতে চায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, এ বয়সে বালক অকস্মাৎ শরীরে বাড়তে থাকে। কেমন ঢ্যাঙা ঢ্যাঙা হাত-পা, গলার স্বর ভেঙে গিয়ে কর্কশ শোনা যায়। জামার আড়ালে আরও যে পরিবর্তনের শুরু হয়, পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের প্রভাবে অচেনা উত্তেজনা, লিঙ্গের উত্থান এবং রাতে ঘুমের মধ্যে নিঃসরণ— তাকে একদিকে তাড়না দেয় আরেক দিকে সংকোচ এবং একরাশ জিজ্ঞাসায় দীর্ণ করে। বয়ঃসন্ধির মেয়েশিশুর অভিজ্ঞতাও একই। কিন্তু পরিবার, স্কুল, সমাজ এই নিতান্ত জৈবিক পরিবর্তনের একান্ত সংবেদনশীল সময়ে তাদের পাশে থাকে না। ছেলেরা ছোটদের সঙ্গে মিশতে পারে না, বড়দের কাছে গেলে তারা খেদিয়ে দেয়। বেচারাকে লজ্জা, ভয়, জটিল সব জিজ্ঞাসা যখন দিশেহারা করে তোলে, তখন পরিবার, স্কুল, সমাজ উল্টো বড় হয়ে ওঠার সুবাদে তার সামনে নিত্য নানা কৈফিয়তের ফর্দ হাজির করতে থাকে। কিশোর এবং কিশোরী— যারা আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী আদতে শিশু, তাদের এভাবে আমরাই প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলি। ঘরে ঘরে এমন প্রতিপক্ষের সংখ্যা শুধুই বাড়ছে।
আরেকবার বলি, কিশোর প্রধানত চায় নিজেকে অর্থাৎ নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে এবং তার বাবদ সামান্য স্বীকৃতি। পড়াশোনার বাইরে এর স্বাভাবিক ক্ষেত্র খেলার মাঠ, সংস্কৃতির অঙ্গন, সৃজনশীলতার অপার সুযোগ, সাহিত্য পাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে একটু সময়, একটু আলস্য ও আড্ডা। মা-বাবা, পরিবারের সঙ্গে ভালো সময়ও কাটাতে চায় তারা। কিন্তু বিষয়গুলোর দিকে আমরা মনোযোগ দিলে তো? এর গুরুত্ব বুঝলে তো?
অনেকের মনে পড়বে রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতা, যেখানে বালক অন্ধকার পথ, গভীর জঙ্গল পেরিয়ে ভয়ংকর লড়াই শেষে ভয়-কাতর মাকে যুদ্ধজয়ের বার্তা দেয় আর গর্বিত মা ছেলের গালে চুমো দিয়ে বলে— ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল! কী দুর্দশাই হতো তা না হলে।’ এটাই তো বালকের স্বপ্ন, দুর্বার মনের ইচ্ছা। কিশোরের মনে বীরত্বের প্রতি তীব্র টান সহজাত। বরং রবীন্দ্রনাথ সেই কবিতা রচনার শতবর্ষ পরে আজ কিশোরীরাও এমন স্বপ্ন দেখতে পিছপা হয় না। মনে আছে নিশ্চয়ই নজরুলের সংকল্প কবিতায় কিশোর দম্ভ করে বলেছে, ‘থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে।’ এটাই কিশোর-কিশোরীর অন্তরের কথা— সে ঘিরে ধরা কারা প্রাচীর ভাঙতে চায়, চায় মুক্তি এবং শুধু দেখতে চায় না বিশ্বজগৎকে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়।
কিন্তু তার বাস্তবতা কী? ভালো খবর হলো, পড়ালেখার প্রতি আম-মানুষেরও আগ্রহ ক্রমাগত বেড়েছে— সরকারি-বেসরকারি-আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ফলে স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে আশাতীত। কিন্তু এর বিপরীতে দুঃসংবাদ হলো, আমাদের পূর্বানুমান ও অর্থের অভাব এবং উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার যুগপৎ ঘাটতির ফলে দেশের প্রায় ৪ কোটি স্কুল শিক্ষার্থীর অধিকাংশকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে শ্রেণিকক্ষের নামে অপরিসর, কখনো স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর কক্ষে। শুধু অবকাঠামোয় নয়, উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগও সম্ভব হয়নি। তাতে কী হলো? লেখাপড়ার মান যাই হোক, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ভালো রাখার চাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার সামগ্রিক জোর গিয়ে পড়ল পরীক্ষার ওপর। একে সুযোগ-সুবিধার টানাটানি তাই শিশুর সংখ্যা বেশি। প্রতিকার হলো বাছাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানো। এটাই, এটুকুই শিক্ষা। মানবশিশুর বিকাশ-পর্বের ব্যাপক চাহিদার নিদান দিলাম একটি মাত্র সূচকে— পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জন। এই লেখাপড়ার মান, সীমাবদ্ধতা এবং অনেকাংশে ব্যর্থতার বিষয় আজকে আলোচনায় টানব না। কারণ লেখার বিষয়ের কারণে তার চেয়ে জরুরি হলো, লেখাপড়ার সঙ্গে এর মূল চাহিদাগুলোর— যেমন ভাষাগত দক্ষতা (বাংলা-ইংরেজি), গণিতের দক্ষতা, বিজ্ঞান ও ইতিহাসে শ্রেণি উপযোগী জ্ঞান এবং মানবিক গুণাবলি, শৈল্পিক সৃজনশীলতা ও রুচিবোধ, সাধারণ ভদ্রতা-সৌজন্য বোধের সঙ্গে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদি— এসবের অর্জন ও অব্যাহত বিকাশ। লোহা গরম থাকতেই ঘা দিতে হয়, শৈশব-কৈশোরেই জীবন-পথের যাত্রার রসদ জুগিয়ে দিতে হয়।
কালে কালে নগর ও নাগরিক বিস্তারের প্রেক্ষাপটে আরও যেসব ঘটেছে, তার কয়েকটা যোগ আছে কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে। পঞ্চাশ বছরে সাড়ে সাত কোটি থেকে জনসংখ্যা সতেরো কোটি ছাড়িয়েছে। স্বভাবতই সেই হারে বেড়েছে শিশু-কিশোরের সংখ্যা, যা এখন কম করে পাঁচ কোটি। এদিকে নগরমুখী জনতার ঢল তো চলছেই। একে একে উধাও হতে থাকল শহরের মাঠ, পুকুর, পার্ক, গাছপালা, ফাঁকা খাসজমি অর্থাৎ শিশুদের বিচরণের খেলার মাঠ। এই বাস্তবতাই যেন বৈধতা দিয়েছে শিশুর জীবন থেকে পাঠ-ভিন্ন বাকি সব ছেঁটে দেওয়ার গর্হিত অপরাধটিকে। ওরা এখন ফ্ল্যাট, স্কুল, কোচিংয়ের এবং পড়া ও পরীক্ষার কারাগারে বন্দি। সঙ্গে মনে রাখতে হবে ওদের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে ভয়-লজ্জা-উত্তেজনার কথা। না পায় কারও কাছ থেকে সৎ পরামর্শ, না ক্ষোভ-ক্রোধের বাষ্প বের করে দেওয়ার কোনো উপায়। খোপে বন্দি শিশুর অন্তরে কী সব বিস্ফোরক জমছে আমরা খবর রাখি না। বন্দির জীবনে আনন্দ নেই, খুব স্বাভাবিক যে তাদের মনে দুর্বোধ্য রাগ, ক্ষোভ এবং দুঃখ, লজ্জার জটিল বোঝা জমছে। অথচ এ বোঝা ওর প্রাপ্য ছিল না, কোনোভাবেই নয়। কেন অনেক ছেলেমেয়ে পড়ালেখা থেকে ঝরে যাচ্ছে, তাদের গতি কী হচ্ছে, কার কাছ থেকে সমাজ কেমন ঘা খাবে, তার আন্দাজও আমরা করতে পারি না।
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এখন প্রায়ই খবরের শিরোনাম হচ্ছে, অপরাধ আর ছোটখাটো ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই, হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধেও অনেকে পিছপা হচ্ছে না। দুঃখের বিষয়, অবস্থা এ পর্যন্ত না যাওয়া পর্যন্ত সমাজ জাগেনি। নানাভাবে জাগার বাঁশি বেজেছে, কেউ সাড়া দেয়নি
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এখন প্রায়ই খবরের শিরোনাম হচ্ছে, অপরাধ আর ছোটখাটো ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই, হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধেও অনেকে পিছপা হচ্ছে না। দুঃখের বিষয়, অবস্থা এ পর্যন্ত না যাওয়া পর্যন্ত সমাজ জাগেনি। নানাভাবে জাগার বাঁশি বেজেছে, কেউ সাড়া দেয়নি। এখন ঘটনা অনেকদূর গড়িয়ে যাওয়ার মতো সমাজ, সরকার সাড়ম্বরে অনেক কথা বলছে, পুলিশ ছোটোছুটি করছে, কিছু গ্রেপ্তার হচ্ছে, বিচার এবং শাস্তিও হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন যৎসামান্য তাপ্পির কাজ।
কথা হলো, সমস্যা সমাধানের কাজে রোগীর কথাই আগে ভাবতে হবে। কেউ যদি একবারেই চূড়ান্ত সমাধানের আশা করেন, তবে ভুল হবে। প্রথম কথা হলো খুন, বন্দুকযুদ্ধ, অপহরণ, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের বিচার তো হতেই হবে। যদিও এ হবে কার্যত আমাদের সমবেত ব্যর্থতার দায়ে কিশোরের দণ্ডভোগ। আর যেন কেউ কৈশোরে অপরাধী হয়ে না ওঠে, তার পদক্ষেপ হিসেবে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলে নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর সময় কাটাতে হবে, তার পরিমাণ বাড়াতে হবে, খেলাধুলায় আনন্দের মধ্য দিয়েই তাদের শারীরিক গঠন ও শ্রান্তির ভারসাম্য মিলবে এবং দল বেঁধে আশপাশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটালে মন হবে হালকা ও শান্ত। এর সঙ্গে কিশোর যদি অগ্নিনির্বাপণ, ভূমিকম্প প্রস্তুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ইত্যাদি প্রশিক্ষণ পায়, তবে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। বিতর্ক, বই পড়া, বিজ্ঞান, নাটক, আবৃত্তি, চারুকলা, গান, সংস্কৃতিচর্চার ক্লাব গঠন করে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যদি তাদেরই পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে চমৎকার ফল পাওয়ার আশা করা যায়।
যাদের মুখে অবিশ্বাসের হাসি তাদের বলি, কিশোর-কিশোরীর মূল চাহিদা মাত্র দুটি— প্রথম, সেই বীরপুরুষ কবিতার বালকের মতো ছকের বাইরে গিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ। দ্বিতীয়টি একটু বুঝিয়ে বলি। সব মানুষ নিজের শারীরিক অস্তিত্ব বা জীবনটাই নানা অভিজ্ঞতায় যাপন করি, এটাই ইহকাল এবং তা করি পরিপার্শ্বের এই ইহজগতে। ফলে মানুষকে শরীরভিত্তিক ইহজীবনকে যেমন, তেমনি পরিপার্শ্বের প্রাকৃতিক জগৎকেও জানতে হয়। আর এই রসদ সে নিতে শুরু করে শৈশব থেকেই। সে কারণেই মানবশিশু অপার বিস্ময়ে নিজের শরীর, তার বৃদ্ধি ও রূপান্তর যেমন, তেমনি আশপাশের প্রকৃতির বৈচিত্র্য-বৈভব, সৌন্দর্য-রূপান্তর সবই বিস্ময়ে পুলকে দেখতে থাকে, উপভোগ করতে থাকে। এভাবেই কিশোরের মনে গভীর ভালোবাসা, দৃঢ় বন্ধন, মহৎ দায়িত্ববোধ, বৃহতের সঙ্গে একাত্মতার বোধ তৈরি হয়। এই সংযোগ ছিন্ন হলে কিশোর প্রাণ কষ্ট পায়। তখন যে মন কোমল হওয়ার কথা, তাতে নানা বিকার দেখা দেয়। আমরা বিকারগ্রস্তের প্রলাপোক্তি শুনে বিরক্ত হই। কিন্তু তার বার্তাটা শুনতে পাই না। তখন নিরুপায় কিশোর ভয়ংকর কিছু করার পথ ধরে। আমরা কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ঠেকাতে আইন, পুলিশ, আদালত নিয়ে হামলে পড়ি। কিন্তু বিদ্রোহের আগুন ছাইচাপা পড়ে, নেভে না, আবার ফুঁসে ওঠার অপেক্ষায় থাকে।
লেখক: কবি-প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক




