অসমাপ্ত এক গানের বেদনা

কাওসার চৌধুরী
তুর্কি কবি নাজিম হিকমত তার ‘জেলখানার চিঠি’ কবিতার এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘...অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয় আমি দেখব আমার বন্ধুদের, তোমাকে দেখব। আমার সঙ্গে কবরে যাবে শুধু আমার এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।’ শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার আমীরুল ইসলামের সৃজনশীল জীবনটাও অনেকটা ওরকমই; অসমাপ্ত।
আমীরুলের লেখনীর জগৎটা ছিল ছন্দ, পঙ্ক্তি আর উপমায় ভরা। কিন্তু তার নিজের জীবনে দৃশ্যমান কোনো অন্তমিল ছিল না। তার জীবন ছিল উদ্দাম, ‘মুক্ত-জীবনানন্দে’ ভরা।
আশির দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ওর সঙ্গে প্রথম দেখা। বয়সে আমি জ্যেষ্ঠ হলেও জ্ঞানে এবং জ্ঞানচর্চায় আমীরুল আমার চেয়ে বহু গুণে জ্যেষ্ঠ থেকে গেছে আমৃত্যু। ওর সঙ্গে তর্ক হতো প্রতিনিয়ত। তবে তর্ক শেষে আবার গলাগলি-সখ্যই ছিল নিত্যদিনের চিত্র।
শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম বলেছিলেন, আমীরুল ছিল ‘ছড়ার রাজপুত্র’। অভিনেতা শহীদুল আলম সাচ্চু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল— আমীরুল, গুরু তুমি এত ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখি করো কখন? উত্তরে হেসে বলেছিল, ‘ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই শুরু করি, সূর্য আলো ছড়ালেই লেখা বন্ধ করি।’
লুৎফর রহমান রিটন, আহমাদ মাযহার ও আমীরুল— এই তিনজন ছিল হরিহর আত্মা। একসঙ্গে দেখলেই আমি হেড়ে গলায় গেয়ে উঠতাম, ‘তিনটি মন্ত্র নিয়ে যাদের জীবন— সত্যম শিবম সুন্দরম, মর্ত্যের পৃথিবীটা তাদের কাছে এক আনন্দ আশ্রম।’ জীবিকার তাগিদে রিটন ও মাযহার দুজনই দীর্ঘদিন থেকে দুটি পশ্চিমা দেশে নোঙর ফেলেছে। আর আমীরুল তো চিরতরে ঘুমিয়ে গেল বাংলার পলিমাটিতেই, তার মায়ের বুকে। ত্রিভুজটি ভেঙে গেল হঠাৎ করেই। হায়...।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ‘সান স্ট্রোক’ হয়েছিল আমার। সেদিন শোভাযাত্রা যখন বাংলা একাডেমি অতিক্রম করছিল, মাথাটা হঠাৎ চক্কর দিয়ে উঠল। কিন্তু পড়ে যাওয়ার আগেই আমাকে ধরে ফেলে মাযহার। প্রাথমিক শুশ্রূষার পর ধানমন্ডির একটা ক্লিনিকে নেওয়া হলো।
শোনেন কাওসার ভাই, আমীরুল কোনোদিন অন্ধ হবে না। আমীরুলের চোখ খোলাই আছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি— আপনি এখন সাগর ভাইয়ের দিক থেকে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে চোখ দুটো মোছার চেষ্টা করছেন
প্রায় দিন তিনেক ক্লিনিকে ছিলাম। প্রতিদিনই পালা করে আমীরুল, মাযহার ও গোলাম মর্তোজা ক্লিনিকে থাকত। বাসায় ফেরার পরও কিন্তু আমীরুল হপ্তাখানেক প্রতিদিন সন্ধ্যায়, আমার শুভানুধ্যায়ীদের এনে আড্ডা দিত; আমাকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টায়।
নব্বই দশকের শেষভাগে আমীরুল সদলবলে যোগ দিয়েছিল ‘ইমপ্রেস টেলিফিল্ম’-এ; পরে চ্যানেল আইতে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘ কয়েক বছর আমীরুল চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে।
আমীরুলের খারাপ দিক যদি বলতে হয়, সেটি তার নিজের প্রতি উদাসীনতা আর অবহেলা। খুব উঁচু মাত্রায় ‘ডায়াবেটিস’ থাকা সত্ত্বেও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিপন্থী কাজগুলোই সে সোৎসাহে করে যেত নিত্যদিন। নিষেধ করলে উল্টো জ্ঞান দিত। একটার পর একটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করল।
মার্চ মাসের শেষের দিকে চ্যানেল আইতে গিয়ে শুনি, আমীরুল চোখে দেখতে পায় না। তার পরও নিয়মিত অফিস করছে। অদ্ভুত মানসিক শক্তি ছিল। চ্যানেল আইয়ের জেনারেল ম্যানেজার হেলাল সাহেব বললেন, ‘যাওয়ার আগে আমীরুল ভাইকে একটু দেইখা যাইয়েন। আপনার কথা শুনলে সে খুশি হবে।’ আমি আর্দ্র চোখ মুছে বলি, দৃষ্টিহীন আমীরুলকে নিজের চোখে দেখে সহ্য করতে পারব না।
যে আমীরুল আমাকে দেখলেই হইহই করে উঠত, পুরান ঢাকার ভাষায় কিঞ্চিৎ ভর্ৎসনা করেই বলত, ‘এই যে জমিদার তনয়, খানাপিনা খাইছেন; নাকি অহনো মালসা নিয়ে ঘুরতাসেন খাবারের আশায়! আমার লগে বহেন; খাইয়া লন দুইটা। নিজে রান্না করছি— পটোল দিয়া গরুর মাংস, মটরশুঁটি দিয়া কই মাছ, পুঁইশাক ইলিশের মাথা দিয়া, করলা ভাজি আর বেগুন ভর্তাও আছে। শেষে খাইবেন ঘিয়ে ভাজা ডাল। বুইঝ্যা দ্যাহেন।’ সেই প্রগল্ভ আমীরুল আমাকে দেখতে পাবে না— এটা আমি ভাবতেই পারি না।
নিয়তির কী পরিহাস! ওই ঘটনার দুই কি তিন দিন পরে চ্যানেল আইতে গিয়েছিলাম কী একটা কাজে। আমীরুলের রুম এড়িয়ে সন্তর্পণে সাগর ভাইয়ের (ফরিদুর রেজা সাগর, চেয়ারম্যান- ইমপ্রেস টেলিফিল্ম) কামরায় ঢুকেছি কেবল। দেখি, হুইল চেয়ারে বসে সাগর ভাইয়ের সঙ্গে কী একটা জরুরি বিষয়ে মিটিং করছে আমীরুল। ওদের কথা শেষ হতেই আমীরুলের কাঁধে হাত রেখে বলি— আমীরুল, আমি কাওসার ভাই।
সে একটু কপট রাগ দেখিয়ে বলে, আমি আপনার লগে কথা কমু না। সেদিন আপনি হেলাল ভাইয়ের কাছে বইলা গেছেন— ‘অন্ধ আমীরুলের সামনে আপনি যাবেন না; সহ্য করতে পারবেন না, তাই।’ শোনেন কাওসার ভাই, আমীরুল কোনোদিন অন্ধ হবে না। আমীরুলের চোখ খোলাই আছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি— আপনি এখন সাগর ভাইয়ের দিক থেকে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে চোখ দুটো মোছার চেষ্টা করছেন। আরও কিছু বলব? আমি ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে আমার কপালটা ঘষতে থাকি।
আমীরুলের সূত্র ধরে চ্যানেল আই এবং এর কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগর সম্পর্কে দু-একটা কথা না বললে পাপ হবে। তার মতো ‘মানবিক’ উদ্যোক্তা আমি কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। যতটা জানি, আমীরুলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল চিকিৎসার ব্যয় কিন্তু মিটিয়েছেন তিনি। প্রতি একদিন পরপর আমীরুলকে ‘ডায়ালাইসিস’ করতে হতো। সেটি এক দিন-দুদিন নয়; বছরের পর বছর। তার সবটুকু ব্যয় হাসিমুখে নির্বাহ করেছেন সাগর ভাই। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই এই সুবিধা পেয়ে আসছেন।
ভাই আমীরুল, এখানে তুমি অসুখী ছিলে— এ কথা বলা যাবে না। জীবনটাকে তুমি উপভোগ করেছ নিজের মতো করেই। ওপারেও উপভোগ করো নিজের পছন্দেই। ভালো থেকো ভাইটি। বিদায়।
লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা




